Advertisement

সুপারনোভা



জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে---- এই মহাসত্যের ঊর্ধ্বে নয় বিশাল নক্ষত্রগুলো। এত শক্তি এত উত্তেজ, এত দম্ভ একদিন নক্ষত্রেরও ফুরিয়ে যায়।
সব মানুষ যেমন একইভাবে মৃত্যুবরণ করে না, ঠিক তেমনি সব নক্ষত্রও একইভাবে জীবনের ইতি টানে না।
যেসব নক্ষত্রের ভর সূর্যের ভরের চেয়ে ১০ থেকে ১৫ গুণ বেশি তাদের জীবনের সমাপ্তি ঘটে সুপারনোভার মাধ্যমে।
সাল ৩০০০।ফাহিম অমরত্বের জুস খেয়ে চলে গেল সূর্যের ভরের চেয়ে ১০থেকে ১৫ গুণ বেশি ভরের নক্ষত্রের কাছে। সে দেখতে চায় সুপারনোভা সম্পর্কে সে যা জানে সেটাই কি নক্ষত্রের মধ্যে ঘটে।

সে গিয়ে দেখল একটি নক্ষত্রের মধ্যে প্রতিনিয়ত নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়ার কারণে হাইড্রোজেন হিলিয়াম এ পরিণত হচ্ছে এবং প্রচুর শক্তি উৎপন্ন হচ্ছে।
এখন নক্ষত্রে কেন নিউক্লিয়ার ফিউশন হয়?

🛑হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল সে বিজ্ঞান বইয়ে পড়েছিল- নক্ষত্রের কেন্দ্রের তাপমাত্রা কোটি কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়। যার ফলে পরমাণুগুলোর ইলেকট্রন কক্ষপথ থেকে বের হয়ে যায় এবং নিউক্লিয়াস গুলো পরস্পরের সাথে প্রচন্ড বলে ধাক্কা খেয়ে নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়ার উদ্ভব ঘটায়। এই নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়ার কারণেই কিন্তু নক্ষত্রগুলো আলো নিঃসরণ করে। কারণ বিক্রিয়ায় প্রচুর শক্তি উৎপন্ন হয় যা রেডিয়েশন আকারে বাইরের দিকে বের হয়ে আসে।

☝️আবার একটি নক্ষত্রের মধ্যে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন টন গরম প্লাজমার ভরের কারণে সেটি নক্ষত্রের কেন্দ্রের মহাকর্ষীয় বল দ্বারা কেন্দ্রের দিকে আকৃষ্ট হয়। অর্থাৎ একটি অন্তর্মুখী চাপ সৃষ্টি হয় আর নিউক্লিয়ার ফিউশন এর ফলে যে শক্তি উৎপন্ন হয় তা বাইরের দিকে এক বহির্মুখী চাপ সৃষ্টি করে। তাই নক্ষত্র সাম্যাবস্থায় থাকে।
🧐 ফাহিম নক্ষত্রে গিয়ে অন্তর্মুখী এবং বহির্মুখী চাপ ভালো মত পর্যবেক্ষন করলো। এখন সে কিছুটা স্যাটিসফাইড। বিজ্ঞান বইয়ে আন্দাজে কিছু লেখা থাকে না।
এখন সে অপেক্ষা করছে যে কখন সুপারনোভা হবে।
সে বইয়ে পড়েছিল সাম্যাবস্থা নষ্ট হয় নিউক্লিয়ার ফিউশন বন্ধ হওয়ার কারণে‌। নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া তো মিলিয়ন মিলিয়ন মিলিয়ন বছর পর্যন্ত চলতে থাকে।
তাই ফাহিম এখন অপেক্ষা করছে কখন নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাবে।

যেহেতু সূর্যের ভরের চেয়ে ১০-১৫ গুণ ভরের নক্ষত্রের মধ্যে ফাহিম তাই সেক্ষেত্রে তার পড়া বই অনুযায়ী নিউক্লিয়ার ফিউশন ঘটতে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত না আয়রন পরমাণুর সৃষ্টি হয়। আয়রন পরমাণুর সৃষ্টির আগ পর্যন্ত ফিউশন বিক্রিয়া ঘটতে থাকে। পর্যায়ক্রমে কার্বন, অক্সিজেন, নিয়ন, সিলিকন উৎপন্ন হতে থাকে। অর্থাৎ প্রতিবারই ভারী মৌল ফিউশন এর মাধ্যমে উৎপন্ন হতে থাকে। শেষমেষ আয়রন পরমাণুর সৃষ্টি হয়।

মিলিয়ন মিলিয়ন মিলিয়ন বছর অপেক্ষা করার পর ফাহিম আয়রনের দেখা পেল।

তার স্যার তাকে বলেছিল আয়রনের পর আর ভারী কোনো মৌলের সৃষ্টি হয় না নিউক্লিয়ার ফিউশন এর মাধ্যমে।
তখন সে স্যারকে প্রশ্ন করেছিল যে আয়রন এর পর অন্য কোন মৌল নিউক্লিয়ার ফিউশন এর মাধ্যমে সৃষ্টি হয় না কেন।
🎃স্যার বলেছিল-আয়রনের নিউক্লিয়াস সবচেয়ে স্থায়ী। এর কোনো শক্তি নেই যে সে ফিউশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে দিবে।
🤓এবার সে স্বচক্ষে দেখল আয়রনের পরমাণু গুলো নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া ঘটাচ্ছে না।

🎃আয়রন সৃষ্টি হওয়ার পর আয়রনের পরমাণুগুলো মিলে মিলে একটা আয়রনের গোলক সৃষ্টি করবে যা নিউক্লিয়ার ফিউশন এর মাধ্যমে শক্তি উৎপন্ন করে না। অর্থাৎ বহির্মুখী চাপ সৃষ্টি করছে না। ফলে মহাকর্ষ বলের কারণে এই গোলক সংকুচিত হতে শুরু করবে।

🧑‍🚀ফাহিম উত্তেজিত। এখনি মনে হয় সুপারনোভা হবে। কারণ সে মনে করত সাম্যাবস্থা নষ্ট হলেই বিস্ফোরণ ঘটবে। বইয়ের মধ্যে কি সব ফার্মি প্রেসারের কথা লিখে রাখছে।কিন্তু সুপারনোভা হলো না তো!
তখন সে বুঝল আয়রনের এই সংকুচিত গোলককে দাঁড় করিয়ে রাখবে এক বিশেষ ধরনের চাপ যাকে ফার্মি প্রেসার বলে। ফার্মি প্রেসার আসলে কি সেটা ফাহিম মনে করতে পারছে না। তাই সে তার সাথে নিয়ে আসা বই থেকে দেখলো-

🌘প্রতিটি আয়রন নিউক্লিয়াসের সাথে কিছু ইলেক্ট্রন যুক্ত থাকে। এই ইলেক্ট্রনরা ফার্মিয়ন। ফার্মিয়নরা একটু চঞ্চল।তারা স্থির ভাবে এক জায়গায় বসে থাকতে পারেনা। অর্থাৎ এক অবস্থায় থাকতে পছন্দ করে না। ফলে খুব বেশি কাছাকাছি চলে এলে এদের মধ্যে একটা চাপ সৃষ্টি হয়। এই চাপটাকেই বলে ফার্মি প্রেসার যা নক্ষত্রের ভিতর ওই আয়রনের গোলকটাকে টিকিয়ে রাখে।

কিন্তু সবসময় ফার্মি প্রেসার আয়রনের গোলককে টিকিয়ে রাখতে পারে না। কারণ নক্ষত্রের ভিতরের আয়রনের গোলকের ভর যখন বাড়তে বাড়তে একটি নির্দিষ্ট ভরকে অতিক্রম করে তখন তাকে ফার্মি প্রেসার দিয়ে আর টিকিয়ে রাখা যায় না। যে ভরের সীমা পর্যন্ত ফার্মি প্রেসার আয়রনের গোলক কে টিকিয়ে রাখতে পারে, তাকে চন্দ্রশেখর লিমিট বলে।
🌈চন্দ্রশেখর লিমিট টি হচ্ছে সূর্যের ভরের প্রায় দেড় গুণ।
⛈️এবার ফাহিম অপেক্ষা করতে থাকলো কখন আয়রনের গোলকের ভর সূর্যের ভরের দেড় গুণ হবে।
🌍সে আয়রনের গোলকের দিক দেখতে থাকলো। দেখল সেটা সংকুচিত হতেই থাকলো। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে সংকুচিত হতে হতে নিউট্রন বলে পরিণত হবে। তাহলে ইলেকট্রন আর প্রোটন কোথায় গেল? এই প্রশ্নটিই ফাহিম করেছিল তার স্যারকে।
🙋উত্তরটি ছিল-খুব বেশি ঘনত্বের কারণে আয়রন নিউক্লিয়াসগুলো ইলেক্ট্রনদের খুব কাছে পেয়ে যাবে। আর তাদের খেয়ে নেওয়া শুরু করবে। একে বলে K-ক্যাপচার প্রসেস। পরমাণুর মধ্যে ইলেক্ট্রনগুলো তো K, L, M এইসব কক্ষে নিউক্লিয়াসের চারিদিকে ঘুরছে, K-টা সবচেয়ে কাছে। K-ক্যাপচার প্রসেসে, নিউক্লিয়াস K কক্ষের ইলেক্ট্রনগুলোকে খেয়ে নেয়। তো সেই K-ক্যাপচারের মতোই একটা পদ্ধতিতে আয়রন নিউক্লিয়াসগুলো ইলেক্ট্রনগুলোকে খেতে শুরু করে। নিউক্লিয়াসের ভিতরে যে প্রোটনরা আছে, তারা ইলেক্ট্রনের সাথে মিলে নিউট্রনে পরিণত হয়।

👍এই পরিবর্তনটা ইলেকট্রো-উইক ফোর্সের মাধ্যমে হয়। তবে এটি এমনি এমনি হবে না। কোনো কিছু পেতে হলে যেমন কোন কিছু দিতে হয় ঠিক তেমনি নিউক্লিয়াসকে কিছু দিতে হবে।সেটা হলো একটা নিউট্রিনো। এই নিউক্লিয়াসগুলো থেকে সেই নিউট্রিনোগুলো বেরোতে থাকে। এইভাবে একটা নিউট্রনের গোলক তৈরী হবে। নক্ষত্রের কেন্দ্র এখন নিউট্রন স্টার হয়ে দাঁড়িয়েছি।

☝️যেহেতু নিউট্রন স্টার আয়রনের গোলকের চেয়ে আরো সংকুচিত হয়ে যায়, তাই হঠাৎ করে প্রচুর gravitational binding energy ছাড়া পেয়ে যায়।
আর সেই শক্তি যাবে কোথায়? জিনিসপত্র গরম করতে যাবে। ফলে এই নিউট্রন স্টারটা খুব গরম হয়ে যায়।আলো হিসেবে শক্তিটা বেরোতে পারবে না। কারণ কম্পটন বিক্ষেপণ।নিউট্রন স্টারের চারিদিকে ইলেক্ট্রনের আবরণ, আটকে দেয় আলোককণাকে।
🙋ফাহিম সবই বুঝে ছিল কিন্তু কম্পটন বিক্ষেপণটা মনে করতে পারছে না। তাই সে আবার কম্পট বিক্ষেপণ সম্পর্কে জানার জন্য বই হাতে নিল। বইয়ে লেখা আছে-
🤓মুক্ত ইলেক্ট্রন দ্বারা ফোটন কণার বিক্ষেপণকেই কম্পটন বিক্ষেপণ বলে।
এরপরে ফাহিমের মনে আরেকটি প্রশ্ন আসে নিউট্রন স্টার থেকে কিভাবে gravitational binding energy বের হয়?
🤓স্যার বলেছিল-নিউট্রিনোর গতিশক্তির মধ্য দিয়ে‌। সেই নিউট্রন স্টার থেকে খালি নিউট্রিনোরাই বেরিয়ে আসতে পারে। নিউট্রিনোরা কারোর সাথে ধাক্কাধাক্কি করে না, সবকিছু ভেদ করে চলে যায়।
☝️একদিকে নিউট্রিনোরা বেরিয়ে আসছে। আরেক দিকে নক্ষত্রের কেন্দ্র চুপসে যাওয়ার কারণে নক্ষত্রের বাইরের স্তর সেই জায়গায় চলে যায়। ফলে নিউট্রন স্টার ধাক্কা খায় এবং বাউন্স অফ করে।এই বাউন্স করার ফলে একটা শক সৃষ্টি হয়। আর নিউট্রিনোদের সাহায্যে সেই শক পুরো নক্ষত্র জুড়ে ছড়িয়ে পরে। তার ফলে কেন্দ্রের বাইরে যে স্তরগুলো ছিল, সেগুলো একটা প্রচণ্ড বিস্ফোরণের মধ্যে দিয়ে ছিটকে যায়। এটাই সুপারনোভা।
😳ফাহিম হঠাৎ করে দেখতে পারল নিউট্রিনো স্টারগুলো বাউন্স অফ করছে। তার মানে এখনই সুপারনোভা হবে। সে আর অপেক্ষা করতে পারছে না। ১৫ সেকেন্ডের মধ্যেই তো সুপারনোভা হওয়ার কথা।
😃ফাহিমের চোখ খুললো। সে কোথায় আছে বুঝতে পারছে না।সে যে নক্ষত্রের মধ্যে নেই সেটা সে সিওর।
তার মানে সুপারনোভা হয়ে গিয়েছে। মহাকাশ দেখলেই সুপারনোভার প্রভাব বোঝা যাচ্ছে।
😁আজ সে বুঝলো বিজ্ঞান কি জিনিস। যে সময় নক্ষত্র পর্যন্ত কেউ পৌঁছাতেই পারত না, সেই নক্ষত্র সম্পর্কে বিজ্ঞান লক্ষ কোটি আলোকবর্ষ দূর থেকেই কত কিছু জেনে গিয়েছিল!
😅এবার ফাহিমের মারা যাবার সময়। সে তার পকেট থেকে মারা যাওয়ার জুসটি বের করল। কারণ সে এখন শান্তিতে মরতে পারবে।
😃নাও আই ক্যান ডাই পিসফুলি- বলে ফাহিম জুসটি পান করল।

তথ্যসূত্র:১.https://youtu.be/udFxKZRyQt4
২.https://youtu.be/YIKXvDlf8_0
৩.https://bigyan.org.in/2015/05/10/supernova/
৪.http://curious7.com/2019/01/19/%E0%A6%95%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AA%E0%A6%9F%E0%A6%A8-%E0%A6%87%E0%A6%AB%E0%A7%87%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%9F/


লিখাঃ কাইফ রহমান

Post a Comment

0 Comments

Close Menu