Advertisement

ভেপিং- ধোঁয়াশা মুক্ত কথা



আপনার হাতের Vape কী আসলেই নিরীহ?

সেন্ট চার্লস, মিসুরিতে অবস্থিত ভ্যাপর ওর্ক্স নামের এক ই-সিগারেটের দোকানে সারি সারি করে সাজিয়ে রাখা বিভিন্ন ফ্লেভারের দিকে তাকিয়ে একরাশ ঘন মিষ্টি ঘ্রাণ ছড়িয়ে ভিকি বেকম্যান বললেন, "আমার ফলের ফ্লেভারগুলো ভাল লাগে।"

বেকম্যান ভ্যাপর ওর্ক্সের একজন কর্মী যিনি চারবছর আগে সিগারেটের অভ্যাস ত্যাগ করতে ই-সিগারেট ব্যবহার করা শুরু করেছিলেন। এমনকি তার বাবাকেও উৎসাহ দিয়েছিলেন। তার বাবাকে সাবধানী দেয়া হয়েছিল যে ধূমপান তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াবে, বেকম্যান বলেন, 'আমি বাবাকে বললাম যে শুধু একবার চেষ্টা করেই দেখ, আমি নিজেই তোমাকে প্রতিদিন কিনে দেব।" ফলাফল, গত তিনবছরে তার বাবা আর সিগারেট ছুয়েও দেখেননি। আর বেকম্যান যা করেন তা হল ধীরে ধীরে কিছুদিন পর পর নিকোটিনের লেভেল কমিয়ে দেন তার বাবার ই-সিগারেটের রিফিলে। "উনি এখন আর আগেকার মত সকালে উঠেই কাশতে থাকেন না। আমার মনে হইয় তিনি আসলেই আরো ভাল অনুভব করেন," বেকহ্যাম জানান।

ই-সিগারেট দিনদিন যত পপুলার হচ্ছে তাতে ভিকির মত গল্প আরো বেশি শোনা যাচ্ছে৷ যেহেতু এতে তামাক ব্যবহৃত হয় না, স্রেফ তাপ ব্যবহার করে নিকোটিন সমৃদ্ধ একধরণের তরলকে বাষ্পীভূত করা হয়, তাই এটা গতানুগতিক ধূমপানের চাইতে আরো বেশি নিরাপদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ই-সিগারেটের পথচলা সেই ২০০০ সালে। সেই থেকে এর প্রসার শুধু বেড়েই চলছে। সম্প্রতি এই ইন্ডাস্ট্রি প্রতি বছর ৪২% হারে বাড়ছে এবং বর্তমানে এটি ৬ বিলিয়ন ডলারের এক বিশাল ইন্ডাস্ট্রি। এমনকি তামাক ইন্ডাস্ট্রিও তাদেরকে আপগ্রেড করে ই-সিগারেট বাজারে আনছে।

শতাধিক ডিভাইস বা হাজারেরও বেশি ফ্লেভার নিয়ে ই-সিগারেট বেশ জনপ্রিয়তা পেলেও সামনের দিনগুলোতে এমন নাও হতে পারে। ২০১৭ সালের মে মাসে FDA সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে ই-সিগারেট পণ্যর ক্ষেত্রে একই ব্যবস্থাপনা জারি করা হবে যা সাধারণ সিগারেটের জন্য প্রযোজ্য। ১৮ বছরের নিচে কারো কাছে ই-সিগারেট বিক্রি করা যদি নিষেধ করা হয় তাহলে উৎপাদক এবং খুচরো বিক্রেতাদের প্রণালী দেখিয়ে লাইসেন্স করিয়ে নিতে হবে, এতে খরচ বেড়ে যাবে তাই ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলো বন্ধ হয়ে যাবে।

আপাতত, ভ্যাপর ওর্ক্সের মালিক, ক্লিফ ব্রাউন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছেন। "আমাদের কোনো ধারণাই নেই এগুলো কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে", তিনি বলেন।

গবেষকদের জন্য ই-সিগারেট নিয়ে কাজ করা একটু মুশকিলই বটে। এর অন্যতম কারণ হল এটি কোনো নির্দিষ্ট ডিভাইস বা নির্দিষ্ট কেমিক্যাল ব্যবহার করে না, তাই এত বৈচিত্রের সবগুলোকে আলাদা করে ফোকাস করে নিয়ন্ত্রণ করা বেশ দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। ই-সিগারেটের ভেতর সবচেয়ে কমন হল একটা কলম আকৃতির রিচার্জেবল ডিভাইস যেটার ভেতর একটা রিফিলযোগ্য ট্যাংকে নিকোটিনযুক্ত তরল থাকে। এই তরলে তাপ দিয়ে সেটা পুড়িয়ে ফেলার বদলে বাষ্পীভূত করে ফেলা হয় আর সেই এরোসল সরাসরি নিকোটিন শরীরে সাপ্লাই দিতে পারে। অনেকেই ধারণা করেন সাধারণ সিগারেটের চাইতে ই-সিগারেট অনেক বেশি নিরাপদ, যদিও সেই ধারণাকে সমর্থন দেয় এমন তথ্য খুবই কম।

কিন্তু যদি কেউ সাধারন সিগারেট থেকে মুক্তি নিয়ে ই-সিগারেটের সান্নিধ্যে আসতে চায় তারা কী নিজেদের এক ধরণের অনুগ্রহ বা উপকার করছে না? "ছোট উত্তর হল, না," বলেন ড. স্টান্টন গ্লান্টজ যিনি ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ায় মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক। গ্লান্টজ ধূমপান ছাড়তে ই-সিগারেটের ব্যবহার নিয়ে করা অনেক গবেষণা বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি দেখেন যে ই-সিগারেট ব্যবহার করে ধূমপান ছেড়ে দেয়ার চান্স উল্টো ২৮% কমে যায়। সম্প্রতি আরেকটি গবেষণায় দেখা যায় যে সবচেয়ে সফলভাবে ধূমপান ছেড়ে দেয়ার ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে না ছেড়ে দিয়ে হঠাৎ ছেড়ে দেয়াই বেশী কার্যকর। "গবেষণার প্রমাণগুলো বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ এক্ষেত্রে যে ধীরে ধীরে ছাড়তে গেলে তা ধূমপায়ীর জন্যই বেশি কঠিন হয়ে যায়," গ্লান্টজ বলেন। "তবে এর মানে এই নয় যে এটা অনেকের ক্ষেত্রে কার্যকর হয় না। অবশ্যই হয়, তবে খুব ছোট অংশে।"

তবে সবার যে একই মত তাও নয়। ইউনিভার্সিটি অফ টরন্টোর গবেষক মুহান্নাদ মালাস বলেন, লং টার্ম র‍্যান্ডমাইজড প্লাসিবো-কন্ট্রোল্ড গবেষণার অভাবের কারণে কোনো উপসংহার টানা বেশ কঠিন। সেগুলোর পরিবর্তে আমাদের কাছে সবচেয়ে ভাল যেই অপশনগুলো আছে সেগুলো হল গ্লান্টজের অবজার্ভেশনাল গবেষণা নিয়ে রিভিউ। মালাসের নিজেরও ৬০ এর অধিক গবেষণাপত্রের রিভিউ আছে যেসব দেখে বোঝা যায় হয়তো ই-সিগারেট কিছু মানুষদের ধূমপান ছাড়তে সহায়তা করে কিন্তু, "সেসবের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ নেই।"

বিজ্ঞানীরা যতই ই-সিগারেট এবং এটা স্বাস্থ্যে কী প্রভাব ফেলে তা সম্পর্কে জানছেন ততই তাদের কাছে পুরো দৃশ্যটা জটিল হয়ে যাচ্ছে। যেমন, কেউ একদম নিশ্চিতভাবে জানে না যে এই পণ্যগুলো ঠিক কতটা বিষাক্ত কারণ ব্যাক্তিভেদে সেগুলোর ব্যবহার পরিবর্তন হতে থাকে। আর মার্কেটিং এর জন্য যাই বলা হয়ে থাক না কেন, ই-সিগারেট নিরীহ জলীয় বাষ্প ছাড়াও আরো অনেক কিছু তৈরী করে।

ই-সিগারেটের যেই তরল থাকে সেটায় propylene glycol, glycerin, nicotine এবং ফ্লেভারিং থাকে যেগুলো খাওয়ার ক্ষেত্রে FDA দ্বারা অনুমোদিত। এগুলো যখন একত্রে তাপ দেয়া হয় তখন carbonyl গ্রুপের কমপাউন্ড তৈরী হয়। উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হল কিছু formaldehyde ও acrolein। যদিও সিগারেট সাধারণত আরো হাজারগুণ বেশি carbonyl তৈরী করে, ই-সিগারেট কতটুকু তৈরী করবে তা নির্ভর করে ভেপিং তরলের ভেতর glycol: glycerin এর রেশিও কতটুকু তার ওপর, অথবা কতটুকু তাপ দেয়া হয় তার ওপর। এমনটাই জানিয়েছেন ড্যানিয়েল কঙ্কলিন, ইউনিভার্সিটি অফ লুইভিলের একজন এনভায়রোমেন্টাল কার্ডিওলজিস্ট।

কিছু নির্দিষ্ট রোগওয়ালা ইদুরদের নিয়ে কঙ্কলিন গবেষণা করেছিলেন কীভাবে ই-সিগারেট CVDs বা Cardiovascular Disease এ প্রভাব ফেলে। Aldehyde এর মধ্যে Acrolein নিয়ে চিন্তা বেশি ছিল কারন এটাই CVD -র ঝুকি বাড়ানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে দায়ী।

সপ্তাহ ধরে ইদুরগুলোকে সাধারণ সিগারেটের ধোয়া এবং ই-সিগারেটের এরোসল দেয়া হচ্ছিল। উভয় ক্ষেত্রেই নিকোটিনের দুইটি concentration ব্যবহার করা হয়েছে- ১০ এবং ৩৬ মিলিগ্রাম প্রতি মিলিলিটার ধোয়া বা এরোসলে। তাদের সাপ্লাই দেয়া Acrolein এর পরিমাণ ছিল ০.৫ এবং ১ ppm. কন্ট্রোল গ্রুপ হিসেবে একদল ইদুরকে স্রেফ নিকোটিন মেশানো পানি দেয়া হয়েছিল।

বলে রাখা ভাল, এক টান ই-সিগারেট সাধারণ সিগারেটের এক টান থেকে নিশ্চয়ই কম ক্ষতিকর। কিন্তু সমস্যা হল একজন সারাদিনে কতগুলো টান দেয় ই-সিগারেটে সেই হিসেব কিন্তু আমাদের কাছে নেই। সাধারণ সিগারেট ছেড়ে দিয়ে ই-সিগারেট ধরে যদি সেটার ব্যবহার অত্যাধিক বেড়ে যায় তখন কিন্তু ক্ষতি অবশ্যই আরো বৃদ্ধি পাবে। কঙ্কলিনের এই গবেষণায় কোনো আশ্চর্য ছাড়াই সাধারণ সিগারেটের ক্ষতিকর প্রভাব সর্বোচ্চ ছিল, atherosclerosis এর ঝুকি তিনগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। মুখে নিকোটিন সাপ্লাই নিয়ে ঝুকি বেড়েছিল দ্বিগুন, আর Acrolein এর প্রভাব ডোজের ওপর নির্ভরশীল ছিল, অর্থাৎ ডোজ যত বাড়ানো হয় ঝুকি ততই বাড়তে থাকে। ই-সিগারেটের ব্যাপারেও একই বিষয় লক্ষ করা গেছে। ডোজ যত বেড়েছে atherosclerosis এর ঝুকি ততই বাড়তে থাকে। এমনকি স্রেফ নিকোটিন যাদের দেয়া হয়েছিল তাদেরও ঝুকি বাড়তে দেখা গেছে।

যদিও তিনি বলেন এটা স্রেফ একটামাত্র গবেষণার ফল তাও আবার ইদুরের ওপর, তাই সম্পূর্ণ নির্ভুল ডাটা আমরা পাইনি। কিন্তু সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হল কে তার ডিভাইস থেকে কতটুকু ভ্যাপর নেয় সেই তথ্য একেবারেই নেই আমাদের কাছে। আবার অনেকে তাদের ডিভাইস মডিফাই করে যাতে ভ্যাপর আরো বেশি পাওয়া যায়। "কিছুটা উদ্বেগ তো অবশ্যই আছে যখন আমরা দেখি কতটুকু Acrolein আসলে তৈরী হচ্ছে এসব ডিভাইসে সে ব্যাপারে আমরা কিছুই জানি না।"

ই-সিগারেট একজন কীভাবে ব্যবহার করেন সেটাও একটা ধোয়াশার ব্যাপার। যেখানে আমাদের কাছে যুগের পর যুগের তথ্য আছে যে একজন সাধারন সিগারেট ঠিক কীভাবে ব্যবহার করেন, আমাদের তেমন কোনো consistent তথ্য নেই মানুষ এর এরোসল আর ফ্লেভার কীভাবে কত পরিমাণে ব্যবহার করে। এক গবেষণায় জানা গেছে, একেক ডিভাইস একেক পরিমাণে নিকোটিন সরবরাহ করে, এবং প্যাকেটের গায়ে যা লেখা থাকে তার থেকে আসলেই এর মাঝে থাকা নিকোটিনের পরিমাণ আলাদা। কঙ্কলিন বলেন, "আমরা আসলে ঠিক জানি না আপনি কত ঘন ঘন ই-সিগারেট ব্যবহার করছেন সারাদিনে সেটা আপনার স্বাস্থ্যে কীভাবে প্রভাব ফেলে।"

ভ্যাপর ওর্ক্সের বেকম্যান বলেন তিনি শান্ত থাকার জন্যেই আগে সিগারেট ব্যবহার করতেন। "আমি বলবনা আমার সেটার স্বাদ ভালো লাগত"। ঠিক যেমন কে তার ডিভাইস কীভাবে ব্যবহার করে সেটার কোনো তথ্য নেই, একইভাবে কে কোন ফ্লেভার বেশি পছন্দ করে সেটারও কোনো তথ্য নেই। হাজারেরও অধিক ফ্লেভার রয়েছে, আসল সিগারট ফ্লেভার থেকে ব্লু বেরী অথবা চুইংগাম, একেক ফ্লেভারে একেক ধরণের কেমিক্যাল।

যখন বেকম্যান ই-সিগারেট শুরু করেছিলেন, তিনি ফলের ফ্লেভারগুলো বেশি পছন্দ করতেন। তার বাবার অবশ্য ফল একেবারেই পছন্দ ছিল না। ব্যাক্তিভেদে পছন্দ আলাদা আলাদা।

মনে হতেই পারে FDA যদি এগুলো এপ্রুভ করেই থাকে তাহলে এত চিন্তার কী আছে? আসলে FDA এগুলো এপ্রুভ করেছে Generally Safe for Consumption এই ক্যাটাগরিতে। অর্থাৎ, এগুলো আপনি গিলে খান, কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা হল পাকস্থলীর রাজ্য আর ফুসফুসের রাজ্য অনেক অনেক আলাদা। ফুসফুসে দেয়ার সময় এগুলোকে তাপ দেয়া হয়, সেখানে নানান রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে, সেগুলো মাথায় নিয়ে safe for inhaling ক্যাটাগরিতে কোনো approval দেয়া নেই।

পপকর্ণের কথা ভাবুন। ২০০০ সালে পপকর্ণ কারখানায় আটজন কর্মী মারাত্বক অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাদের ফুসফুসের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল, পরবর্তীতে এ রোগের নামকরণ করা হয় "Popcorn Lung" বলে। পরে তদন্তসুত্রে জানা যায়, পপকর্ণে দেয়া মাখনের ফ্লেভারের কেমিকেলের diacetyl এরোসল বা ভেপ ফুসফুসে যাওয়ার ফলে এ সমস্যার সৃষ্টি হয়। এখন Diacetyl কীভাবে ফুসফুসের ক্ষতি করে সেটার পুরো মেকানিজম জানা না থাকলেও এগুলো immune cells দের কার্যকারীতা নষ্ট করে দেয়। এখন এই কেমিক্যাল Inhalation Hazard ক্যাটাগরিতে যুক্ত করা। ফ্লেভারিং এ যেই কেমিক্যালগুলো থাকে সেগুলো শরীরের Immune cells দের কার্যকারীতা কমাতে সাধারণ সিগারেটের চেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে। বেকম্যান এই diacetyl এর ক্ষতিকার দিক সম্পর্কে জানেন, তবে তিনি বলেন ফ্লেভার প্রস্তুতকারীরা এটার ব্যবহার ধীরে ধীরে কমিয়ে দিচ্ছে, এবং যদি কোনো ডিভাইসে এই কেমিক্যালের কথা উল্লেখ থাকে, "আমরা সেটা এড়িয়ে চলব।"

সম্প্রতি আরেক গবেষণায় দারুচিনি ফ্লেভারের ই-সিগারেট যারা ব্যবহার করেন তাদের নাকের কোষে এটা তৈরীর জন্য cinnamaldehyde কেমিক্যালের উপস্থিতি পেয়েছেন। একই সাথে দেখেছেন তাদের নাকে থাকা বিভিন্ন immune cells যেমন macrophage, natural killer cells আর neutrophils. এই গবেষণা যেটা কীনা ইউনিভার্সিটি অফ নর্থ ক্যারোলিনায় Toxicologist ইলোনা জ্যাসপারস এবং তার দল করেছিলেন, এটাকে আরো ভালোভাবে বোঝার জন্য সাধারণ ধুমপায়ী এবং অধূমপায়ীদের থেকেও নাকের কোষের স্যম্পল সংগ্রহ করেন। অবশ্যই যারা সাধারণ ধূমপায়ী তাদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে immune কোষগুলো কার্যকারীতা হারাচ্ছে, কিন্তু যেটা আশ্চর্যজনক সেটা হল ই-সিগারেট যারা ব্যবহার করেন তাদের ক্ষেত্রে আরো বেশি immune genes ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রমাণ হয় সাধারণ সিগারেটের তূলনায় ই-সিগারেট, নির্দিষ্ট করে বললে এর মাঝে থাকা ফ্লেভার ও বিভিন্ন কেমিক্যাল কোষের ক্ষতি অনেক বেশি করে।

বিজ্ঞানীদের জন্য বিয়য়টা আরো জটিল। এই মুহুর্তে সাত হাজারেরও বেশি ফ্লেভার পাওয়া যায় ই-সিগারেটের এবং কয়েকশ আলাদা ডিভাইস পাওয়া যায়। এসবের ব্যবহার, ডোজ ইত্যাদির ব্যাপারে গবেষণা চালিয়ে যাওয়া বেশ কষ্টকর। আর সেটা না করা গেলে এদের ভয়াবহতা আসলে কত বেশি তা কখনোই নির্দিষ্ট করে বলা যাবে না।


এই ভেপিং জিনিসটা যদি স্রেফ ধূমপান থেকে বের হয়ে আসার জন্য ব্যবহৃত হত তাহলে হয়তো হেলথকেয়ার বিভাগের লোকজনেরা এতটা চিন্তিত থাকতেন না। কিন্তু সম্প্রতি এক জরিপে উঠে এসেছে, যেখানে ৩২% হাইস্কুলের ছাত্ররা সিগারেট নেয়া শুরু করে, ৪৫% ছাত্ররা তাদের ধুমপান জগৎ এ পা রাখে মুখে ই-সিগারেটের ভেপ নিয়েই।

FDA এর নতুন নিয়ম, যেটা কীনা ধূমপান আর ই-সিগারেট প্রডাক্টকে একই রেগুলেশনের নিচে নিয়ে আসে, হয়তো উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের জন্য ই-সিগারেট ব্যবহার একটু কঠিন করে দেবে, কিন্তু এই এরোসলের ধোয়া মানুষকে ধূমপান ছাড়তে সাহায্য করে নাকি উল্টোটা ধোঁয়াশা আসলে সেখানেই।

বেকম্যানের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা কাজে দিলেও, "অধিকাংশ মানুষদের জন্য ধূমপান ছাড়তে ই-সিগারেট সহায়ক হয় না", বলেন গ্লান্টজ।

ধূমপান ছাড়ার জন্য আপনি কোন পদ্ধতি অবলুম্বন করবেন তা ব্যাক্তিভেদে আলাদা। তবে যারা এটা ছাড়ার জন্য কোনো ডিভাইস ব্যবহার করছেন তারা যদি কোনো কাউন্সিলিং প্রোগ্রামে যুক্ত থাকেন তাহলে সফলতা পান বেশি। গ্লান্টজ বলেন, "যখন মানুষ নিজেই কোনো ই-সিগারেট ব্যবহার করছে দেখা যাচ্ছে সে মাঝে মাঝে ধূমপানও করছে। অর্থাৎ সে এটা ছাড়তে পারছে না সেভাবে। কিন্তু সে যদি কোনো কাউন্সিলিং গ্রুপে থাকে, তার মনে এই চিন্তা থাকে যে সে ধূমপান ছাড়তে চায়, এবং একসময় সফলভাবে ছেড়েও দিতে পারে।"

কোন কোম্পানি ই-সিগারেট তৈরী করছে বা কে এটা বিক্রি করছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গ্লান্টজ আরো বলেন, "আপনি গরম এরোসল, খুবই ক্ষুদ্র জিনিস শ্বাস দিয়ে টেনে নিচ্ছেন যাতে থাকছে aldehyde এবং nicotine, এবং সেটা একেবারেই ভাল নয়। আমরা হয়তো ই-সিগারেট সম্পর্কে সবকিছু জানি না, তবে আমরা অন্তত এটুকু জানি যে এগুলো সিগারেটের চেয়ে কম ক্ষতিকর হলেও নিরাপদ মোটেই না।"

সামনে মেডিকেল কমিউনিটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হল "কম ক্ষতিকর" অজুহাত ব্যবহার করে ই-সিগারেট যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে তার মোকাবেলা করা। তারা বারবার বলে চলছেন ই-সিগারেট যে নিরাপদ সে ব্যাপারে কোনো প্রমাণ নেই, এগুলো যে ধূমপান থেকে বের হয়ে আসতে সহায়তা করে সে ব্যাপারেও কোনো প্রমাণ নেই। অনেক চিকিৎসকের মতে, যেসব রোগীরা ভেপ করেন তারা স্রেফ একটা নিকোটিন আসক্তি থেকে অন্য ভার্সনে বদলি হচ্ছেন।

ভেপিং নিয়ে বিপদের আশংকা থাকলেও ধূমপানই যে সবচেয়ে ক্ষতিকর সে বিষয়ে কারো সন্দেহ নেই। বিশেষ করে যখন আমরা এর মাঝে উপস্থিত অগুনিত কেমিকেলের দিকে তাকাই যেগুলো ভুড়িভুড়ি রোগের জন্য দায়ী যা হয়তো সহজেই প্রতিরোধযোগ্য। এই বিষয়গুলো মাথায় রাখলে এখন কথা আসে যে একজন রোগী যিনি কীনা ধূমপান ছেড়ে দিয়ে এখন ই-সিগারেট ব্যবহার করেন তার মেডিকেল ফোকাস কী হওয়া উচিৎ? তখন কী তাকে ধুমপান না করার জন্য বাহবা দিয়ে সেটাই সফলতা হিসেবে বিবেচনা করব নাকি তাকে ভেপিং ছাড়ার জন্য বলব? যে মানুষ ধূমপান ছাড়তেই চায় না তার জন্য কী বুদ্ধিমানের কাজ ভেপিং করা না? এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে একটা রোগীকে আসলে কী পরামর্শ দেয়া উচিৎ?

এবার নজর দেয়া যাক ধূমপান ছাড়া নিকোটিন নেয়ার ফলে স্বাস্থ্যের কী কী ক্ষতি হয়। American Heart Association এর তথ্য অনুযায়ী অধূমপায়ীদের নিকোটিন নেয়ার ফলে hemodynamic effects, endothelial dysfunction, thrombogenesis, systemic inflammation এবং অন্যান্য metabolic সমস্যা দেখা গিয়েছে।

আর তাই, খুবই স্বাভাবিক যে মেডিকেল কমিউনিটি এই ভেবে চিন্তিত যে ই-সিগারেট যত পপুলার হতে থাকবে বিশ্বজুড়ে নিকোটিন নেয়ার পরিমাণ তত বাড়তে থাকবে আর মানুষের স্বাস্থ্যে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে থাকবে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত নিঃসন্দেহে উঠতি বয়সীরা হবে যেহেতু ই-সিগারেটের হাজারো ফ্লেভারের মোহ তাদের আকর্ষণ করবে বেশি। যেহেতু ভেপিং এ কোনো কিছু পোড়ানো হয় না, কটু ধোয়া হয় না তাই এর বিরোধীরা মনে করেন মানুষ সাধারণ ধূমপানের পরিবর্তে ভেপিং এর দিকে ঝুকবে বেশি। এছাড়াও জনসমাগমের স্থানে ভেপিং বেড়ে যাবে যেহেতু অনেকেই এটাকে ক্ষতিকারক মনে করেন না। বিজ্ঞাপনগুলোতেও এদেরকে নিরাপদ হিসেবে প্রচার করা হয় তাই অনেকেই ভবিষ্যতে শিশুদের সামনেঅ অনায়সে ভেপিং করবেন, তাদের মনে সেই সামান্য খটকাও আসবে না যা সাধারণ ধূমপানের সময় আসে। হেলথকেয়ার কর্মীদের ঝক্কি পোহাতে হবে জনগনকে বোঝাতে যে কোনটা বেশি ক্ষতিকর, ধূমপান করে যাওয়া নাকি ই-সিগারেটের মাধ্যমে নিকোটিনের ডোজ বাড়িয়ে দেয়া। ই-সিগারেটের 
জনপ্রিয়তা আর এসব গণস্বাস্থ্যজনিত সমস্যা সমানুপাতিক।

জনগণদের থেকে কেমন জরিপ পেয়েছি আমরা? 
জরিপ অনুযায়ী ২০০৯ থেকে ২০১১ সালের মাঝে ই-সিগারেটের ব্যাপারে সাধারণ মানুষের আগের তুলনায় চার গুণ বেশি অবগত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি যারা ই-সিগারেট ব্যবহার শুরু করেন তাদের অধিকাংশই ধূমপায়ী। অনেকেই এটা শুরু করেন নিকোটিনের উৎস বদল করতে আর অনেকে শুরু করেন ধূমপান ছাড়ার উদ্দেশ্যে।

FDA বা মেডিকেল কমিউনিটির যতই মাথাব্যাথা থাক এটা ভেবে যে হয়তো ই-সিগারেট দিয়ে শুরু করলে উঠতি বয়সীরা একসময় ধূমপান করবে, এ ব্যাপারে খুব বেশি জোরালো গবেষণা আসলে হয়নি। উল্লেখযোগ্য হল, একটা কোরিয়ান হেলথ প্রজেক্টের তথ্য, যেখানে দেখানো একটা স্কুলের ৪৩৫৩ ছাত্র-ছাত্রীর মাঝে ১০.২% ই-সিগারেট সম্পর্কে জানলেও মাত্র ০.৫% ই-সিগারেট ব্যবহার করেছে।

এছাড়াও, একটা অনলাইন জরিপের কথা বলা যায়। ২২৮ জন পুরুষ ১১-১৯ বছর বয়সীদের মাঝে মাত্র ১% ই-সিগারেট ব্যবহার করেছে। অথচ তাদের মাঝে ৬৭% ই-সিগারেট সম্পর্কে অবগত। যারা কখনো ই-সিগারেট ব্যবহার করেনি তাদের ১৮% বলেছে তারা এটা ট্রাই করতে চায়। ই-সিগারেটের ব্যবহার বা ব্যবহারের ইচ্ছা যাদের মাঝে বেশি দেখা যায় তাদের মাঝে কিছু কমন ফ্যাক্টর হল, পুরুষ, বাসায় কেউ ই-সিগারেট নেয়।

ওপরের দুটো জরিপের ভ্যালিডিটি নির্ণয় করার কোনো উপায় নেই। তবে এসব থেকে অন্তত একটা বিষয় পরিষ্কার যত ই-সিগারেটের জনপ্রিয়তা বারবে ততই উঠতি বয়সীরা এটা সম্পর্কে অবগত হবে। এখন অবগত হওয়ার সাথে ই-সিগারেটের ব্যবহার ঠিক কতটা প্রভাবিত তা নিয়ে গবেষণা হওয়া এখনও বাকি।



Post a Comment

0 Comments

Close Menu