Advertisement

ঘুম ও স্বপ্ন

ঘুম প্রতিটা প্রানীর দরকার। এ সময়টা দেহের বিশ্রামের সময়। ব্রেন ও দেহের অন্যান্য অঙ্গ এ সময় বিশ্রাম নেয় অর্থাৎ তাদের ক্ষয়পূরন করে ফেলে। এ সময়টা আমাদের কনশাসনেস থাকে না। এর মানে কিন্তু এই না যে কনশাসনেস হারিয়ে যায়। কনশাসনেস একেবারে হারিয়ে গেলে মানুষ মারা যায়। ঘুমের একটি পর্যায়ে আমরা আমাদের চারপাশ সম্পর্কে অভিহিত থাকি না। তবে ঘুমের পরেই আমরা সহজে আমাদের কনসাশনেস ফিরে পাই।

ঘুম ও স্বপ্ন


দিনে কতক্ষন ঘুমানো প্রয়োজন? ধরা হয় পূর্নবয়স্ক মানুষের দিনে ৬ থেকে ৮ ঘন্টা ঘুম যথেষ্ট। আমেরিকান বংশদ্ভূত বিখ্যাত ইন্ডিয়ান সাইকোলজিস্ট ও লেখক "রবিন শর্মা" তার বইগুলোতে সফলতা লাভের জন্য সর্বোচ্চ ৬ ঘন্টা ঘুমাতে পরামর্শ দিয়েছেন। তবে ভারতীয় সদ্গুরু দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে দিনে গড়ে ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘন্টা ঘুমান এবং তিনি দাবি করেন তিনি সুস্থ্য আছেন। র্যান্ডি গ্রাডনার ১৭ বছর বয়সে টানা ১১ দি ঘুমিয়েছিলেন যেটা এখনো বিশ্ব রেকর্ড। যারা দিনে সর্বোচ্চ ৪ ঘন্টা ঘুমায় তাদের শর্ট স্লিপার বলা হয়। তবে ৬-৮ ঘন্টাকেই আদর্শ ঘুমানোর সময় বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন।

ঘুমের অংশ মূলত ২ টা। সেগুলো হল  রেম ও নন রেম। নন রেমের অংশ আবার ৪ টা।

রেমঃ রেম হচ্ছে ঘুমানোর ওই সময় যে সময়ে আমাদের মস্তিষ্ক সজাগ থাকে, আমাদের মাংসপেশি শিথিল থাকে, আমাদের চোখ এদিক থেকে ওদিকে ঘুরতে থাকে এবং আমরা স্বপ্ন দেখি। আমরা আমাদের মোট ঘুমানোর সময়ের ২০% এ পর্যায়ে কাটাই।
নন রেমঃ এসময় আমাদের মস্তিস্ক নিস্ক্রিয় থাকে। তবুও শরীর নড়াচড়া করানো যায়। ঘুমের ৮০% এই সময়ে হয় এবং এ সময়ে আমাদের শরীরের কোষ গুলোর ক্ষয়পূরন হয়, হরমোন নিঃসৃত হয়।এর ৪ টি স্টেজঃ
১। ঘুমের আগের স্টেজ - মাংসপেশি শিথিল হয়, হৃদস্পন্দন কমে আসে, শরীরের তাপমাত্রা কমে।
২। হাল্কা ঘুম - এই স্টেজে সহজেই ঘুম ভেঙ্গে যায়, চারপাশ সম্বন্ধে স্বাভাবিক সচেতনতা থাকে।
৩। ‘স্লো ওয়েভ ঘুম’ – ব্লাড প্রেসার কমে, এই স্টেজে লোকে ঘুমের ঘোরে হাটে বা কথা বলে।
৪। গাঢ় ‘স্লো ওয়েভ ঘুম’ – ঘুম সহজে ভাঙতে চায় না। ভেঙ্গে গেলে চারপাশ সম্বন্ধে স্বাভাবিক সচেতনতা থাকে না।
ঘুমানোর কারণ সম্বন্ধে বিজ্ঞানীরা এখনো পুরোপুরি জানতে পারেননি এবং তা নিয়ে বর্তমানে গবেষণা চলছে। আর একটি ব্যপার। ঘুমন্ত মানুষের চেহারার কোন এক অজানা অতিরিক্ত আবেগ অনুভূতি কাজ করে। যা তার গোপন এক প্রাকৃতিক নিরাপত্তা দেয়। বেশি ঘুম হলে শরীর কিন্তু ভালো লাগবে না। বরং আরো ঘুম ধরবে। ওগুলো নিয়েও বলা হবে।
ঘুমের সময়ের সাথে স্বপ্ন ও শারিরীক সুস্থ্যতার বিষয়টিও  জড়িয়ে থাকে। ঘুম ছাড়া বেচে থাকা অসম্ভব কিন্তু বেশি ঘুমে মানুষের শরীরের বিভিন্ন অংশে সমস্যা দেখা দেয়। তাই পরিমীত ঘুম সবচাইতে বেশি জরুরি।

স্বপ্ন কি? স্বপ্ন হল ঘুমন্ত অবস্থায় দেখা বিভিন্ন কাল্পনিক ঘটনা। এটি ব্রেন দিয়েই নিয়ন্ত্রন হয়। ঘুমের ৫স্টেজের একটি হচ্ছে REM বা রেম পর্যায়। এ সময় ব্রেন সজাগ থাকে। এ সময় মানুষ স্বপ্ন দেখে। কি কারণে স্বপ্ন দেখে তার আসল কারণ এখনো অজানা। তবে মনোবিজ্ঞানীরা ধারনা করেন মানুষ তার আশেপাশে যা কিছুই দেখে তা ব্রেনের সাব কনশাস মাইন্ডে বা অবচেতন মনে সংরক্ষিত থাকে। স্বপ্নের সময় যেসব চরিত্র বা ঘটনা আমরা দেখে থাকি তা ব্রেনের অবচেতন অংশেই থাকে বলে অনেক মনোবিজ্ঞানী ধারনা করেন।

স্বপ্ন আমরা কতক্ষন দেখি? গুগলে সার্চ দিলে দেখাবে ৩০ মিনিট। আসলে আমরা দিনে ৫-৭ টি স্বপ্ন দেখি। অনেকে মনে করেন স্বপ্ন কয়েক সেকেন্ডের হয়। আবার অনেকে মনে করেন ২ ঘন্টাও স্বপ্ন দেখেন মানুষ। রেম পর্যায় থাকে ২০-২৫% সময়। মানে আপনি যদি ৬ ঘন্টা ঘুমান তবে ১ ঘন্টা ১০ মিনিট আপনি রেম স্টেজে কাটাবেন। মানুষ শুধু রেম স্টেজেই স্বপ্ন দেখে। তার মানে আপনি ১ ঘন্টা ১০ মিনিটের বেশি স্বপ্ন দেখতে পারবেন না। আবার, রেম স্টেজের প্রথম ৫ মিনিট থেকে সর্বোচ্চ ২০ মিনিট পর্যন্ত মানুষ স্বপ্ন দেখে না। তার মানে মানুষ কি বাকি ৩০-৫০ মিনিট স্বপ্ন দেখে?? নাকি ৭ সেকেন্ড? কোনটা ভুল?

আসলে কোন তথ্যই ভুল না। একেক জন সাইকোলজিস্ট একেক ভাবে উত্তর দিয়েছেন ও তাদের যুক্তি দিয়েছেন। বিখ্যাত মুসলিম সাইকোলজিস্ট Dr. Mustafa Mahmoud ও তার টিম দাবি করেন মানুষ ৭ সেকেন্ড স্বপ্ন দেখে ও তা সম্পূর্ন রেম স্টেজ জুড়ে প্রভাব ফেলে। আবার জোনাস স্লাক দাবি করেন স্বপ্ন মানুষ ৫ সেকেন্ড বা তার কম দেখে!!! আসলে এগুলোর কোন সাইন্টিফিক প্রমান নেই। তাদের বলে দেয়া তথ্য মাত্র। তবে রেম স্লিপের অধিকাংশ সময় মানুষ স্বপ্ন দেখে এবং সময় তাদের ব্রেনে কিছু সিংন্যালের আদান প্রদান হয় এটা প্রমানিত হওয়ায় আপাতত ৩০ মিনিট সময়কে স্বপ্ন দেখার দৈর্ঘ্য ধরা হয়েছে। যদিও বা অনেক বিজ্ঞানী দাবি করেন স্বপ্ন ২ ঘন্টা পর্যন্ত থাকে। এসব কিছুরই এখন পর্যন্ত প্রমানিত হয়নি। আবার কেউ কেউ স্বপ্ন কে টাইমের উর্ধে অর্থাৎ ৪ ডায়মেনশনাল জিনিস বলে মনে করেন। যদিও বা এর পক্ষে কোন প্রমান তারা দিতে পারেন নি।

স্বপ্নে কি গায়েবি জিনিস পাওয়া যায়?
বিজ্ঞানের ভাষায় স্বপ্ন জিনিস টা সম্পূর্ন রূপে ব্রেনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। অনেকে বলেন দিমিত্রি মেন্ডেলিফের পর্যায় সারনি স্বপ্নে পেয়েছেন। বিখ্যাত ভারতীয় গনিতবীদ রামজানু ১০০+ সূত্রের প্রতিপাদন করে বলেছিলেন এগুলো আমাকে স্বপ্নে মা (প্রভু) দিয়ে গিয়েছেন। বিজ্ঞান এ বিষয়ে একমত নয়। কারো স্বপ্নের মধ্যে কেউ প্রভাব ফেলে কোন তথ্য দিতে পারে তা প্রমান হয়নি।( টেলিপ্যাথি) । তাহলে কোথায় পায় বিজ্ঞানীরা এসব তথ্য? অনেক মনোবিজ্ঞানী মনে করেন সর্বদা মানসিক পরিশ্রমী ব্যাক্তি মাঝে মাঝে অনেক তথ্য লক্ষ্য করেন না। সেগুলো সাবকনশাস মাইন্ডে জমা থাকে। ঘুমানোর সময় সাবকনশাস মাইন্ডে বিষইয়গুলো উঠে আসে এবং তা থেকেই তারা বিভিন্ন আইডিয়া খুজে পান।
স্বপ্ন কি সত্যি হয়? ভোরের স্বপ্ন সত্যি হয় বলে অনেকে মনে করেন। এর কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। মানুষের রেম স্টেজ আসে মোটামুটি ভোরের দিকেই। মানুষ বেশিরভাগ স্বপ্নই ভোরের দিকে দেখে। সেক্ষেত্রে সব সত্য হওয়ার কথা। আগেই বয়া হয়েছে স্বপ্নের নিয়ন্ত্রক আপনার অবচেতন মন। হয়তো আপনি যা করতে চাচ্ছেন বা করবেন তাই ফুটে উঠে আপনার স্বপ্নে। পরে কাজটি স্বপ্নের সাথে মিলে গেলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ বিষয়টি আগে থেকেই আপনার মাথায় ছিল।
স্বপ্ন নিয়ে আরো কিছু ছোটখাটো ফ্যাক্ট আছে। যেগুলো পরে একত্রে দেয়া হবে। স্বপ্নে দেখলাম আমি মরে গেছি’—এটা স্বপ্ন দেখা নিয়ে একটা খুবই সাধারণ অভিজ্ঞতা। অনেকেই বলে থাকেন, স্বপ্নে এমন মৃত্যু দেখাটা ভালো না। কিন্তু মনোবিজ্ঞানী রুবিন নাইমান বলেন, এটা নিয়ে দুর্ভাবনার কিছু নেই। তিনি বরং বলছেন, ‘স্বপ্নে মরার সুযোগ পেলে তা মিস করাটা ঠিক হবে না! যান ওই ঘটনাটার অভিজ্ঞতাটা নিয়ে ফেলুন।’
মানুষ দিনে ৫-৭ টি স্বপ্ন দেখতে পারে। তবে সব স্বপ্ন মনে থাকে না। এর পিছনেও বিভিন্ন কারণ রয়েছে যেগুলো পরে বলা হবে। আপনার স্বপ্নের নিয়ন্ত্রক আপনি নিজেই। স্বপ্ন দেখতে থাকুন। Happy Dreaming!!

স্বপ্নের মানে হয় কি?
অনেক রকমের স্বপ্ন দেখি আমরা। স্বপ্নে কেউ ছাদ থেকে পড়ে যায়, কেউবা ধাওয়া খাওয়ার স্বপ্ন দেখে, কেউ বড়লোক হয়ে যায় ইত্যাদি ইত্যাদি। এখন প্রশ্ন হল, এসব স্বপ্নের কি আসলেই কোন মানে আছে? বিজ্ঞানের মতে স্বপ্ন আসলে কিছুই বোঝায় না। এটি শুধু একটা কাল্পনিক ঘটনা যেটা ঘুমের রেম স্টেজে ঘটে থাকে। কিন্তু অনেক মনোবিজ্ঞানী বা সাইকোলজিস্ট তা মানতে নারাজ। তাদের মতে যেহেতু স্বপ্ন ব্রেন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় তাই স্বপ্ন ওই মানুষের চিন্তাভাবনার একটা সারমর্ম।
সুজান বার্কমেন নামক এক সমাজসেবক এবং স্বপ্ন বিশেষজ্ঞ স্বপ্নের মানে বের করেছেন বলে দাবি করেন। তিনি শতাধিক ব্যাক্তির উপর পর্যবেক্ষন করে কিছু স্বপ্নের মানে বের করেছেন। আশ্চর্যের বিষয় হল তার বের করা মানের সাথে অনেকের অবস্থাও মিলে গিয়েছে। তার মত সাপেক্ষে বেশ কিছু স্বপ্নের মানে দেয়া হোল। (ধর্মীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করব না)। আগেই বলে রাখি এসব বিষয়ে সরজমিনে কখনো পরীক্ষা হয়নি। এটি অনেক ক্ষেত্রে মিলে যাওয়া প্রমানবিহীন তত্ব এর মত।

১)স্বপ্নে ছাদ বা উচু কোন স্থান হতে পড়ে যাওয়া/পানিতে ডুবে যাওয়াঃ এটা অনেক কমন একটা স্বপ্ন। যদি আপনি এ স্বপ্ন প্রায় দেখেন তার মানে আপনি টেনশনে আছেন আপনার প্রত্যাহিক জীবন নিয়ে। হতে পারে এটা টাকা পয়সা বা সম্পর্ক নিয়ে, বা পড়ার চাপ নিয়ে। এর মানে সম্পর্কে উনি বলেছেন যে আপনার লাইফ আস্তে আস্তে আপনার নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাচ্ছে।

২)গোলোক ধাধায় হারিয়ে যাওয়াঃ এর মানে হচ্ছে আপনার সামনে কোন কঠিক কাজ বা পরীক্ষা আছে কিন্তু আপনি কি করবেন সেটা বুঝছেন না। সুজান মনে করেন যারা এ ধরনের স্বপ্ন দেখেন, তাদের শারিরীক ও মানসিক ভাবে প্রচুর স্ট্রেস পড়ে তাই তারা এটি দেখেন।

৩)পরীক্ষায় ফেল করা/লেট করে পরীক্ষার হলে প্রবেশঃ সাধারন শিক্ষার্থীরা তো বটেই এমনকি গ্রাজুয়েট পাস করেও অনেক শিক্ষার্থী এ স্বপ্ন দেখেন। এর কারণ সম্পর্কে তিনি বলেছেন যদি সামনে কোন পরীক্ষা থাকে যাকে শিক্ষার্থী খুব সিরিয়াসলি নেয় আর যদি তার জন্য খুব চিন্তিত থাকে তবে অনেক সময় এ ধরনের স্বপ্ন দেখে থাকতে পাড়েন।

৪)ভালো সুযোগ মিস করা/বাস মিস করা/অনুষ্ঠানে দেরি করে যাওয়াঃ এ স্বপ্নটিও অনেকে দেখে থাকেন। এর মানে হতে পারে আপনি আগে খুব ভালো একটা সুযোগ যেমন ভালো চাকরির ইন্টারভিউ বা স্বপ্নের ক্য্যারিয়ার গড়ার সুযোগ মিস করেছেন। এ থেকে আপনার মনে একটা ভয় জন্ম নিয়েছে। তারই প্রক্ষিতে আপনি এ স্বপ্নটি দেখছেন।

৫)স্বপ্নে দেখছেন যে আপনি ঘুম থেকে জেগে উঠেছেন কিন্তু আসলে জাগেননিঃ
এ স্বপ্নটি মানুষ সাধারনত ভোরের দিকে দেখে যখন আপনি প্রায় জেগে গিয়েছেন কিন্তু সম্পূর্নরূপে নয়। স্বপ্নে আপনি দেখেন আপনি ঘুম থেকে উঠে পড়েছেন নিজের কাজ করছেন। এটা হয় কারণ আপনি আপনার আগামী দিনগুলো নিয়ে খুবই চিন্তিত কিন্তু আপনি ভালো ভাবে তা পার করতে চান।

৬)স্বপ্নে আপনি উড়ছেনঃ এর মানে হচ্ছে আপনি আপনার বর্তমান অবস্থায় ভালো আছেন। আপনার সুখি জীবনের প্রতিচ্ছবি এই স্বপ্ন।
এখানে শুধু ৭ টা কমন স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেয়া হল। অনেক সাইকোলজিস্ট একই স্বপ্নের বিভিন্ন ব্যাখ্যা দ্বার করিয়েছেন । তবে সুজান বার্কমেন মেথিড টাই প্রচলিত বেশি। এটি শুধু একটা বিজ্ঞানীর দেয়া মত মাত্র। তাই না মিললে ভয় পাওয়ার কিছুই নেই। তবে আসলে বিজ্ঞান যেহেতু প্রমান ছাড়া কিছু বিশ্বাস করে না এবং স্বপ্নের এসব ব্যাখ্যার তেমন কোন প্রমান না থাকায় বিজ্ঞানের ভাষায় স্বপ্নের কোন মানে নেই।

Writer: Mahtab Mahdi  

Post a Comment

0 Comments

Close Menu