Advertisement

আলোতে আলোকপাত

আলো


অন্ধকার ভয় পান?

এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। অন্ধকারে ভয় পাওয়াটা মানুষের মজ্জাগত। লক্ষ লক্ষ বছরে এভাবেই আমাদের বিবর্তন ঘটেছে যাতে আমরা অন্ধকার বা রাত্রিকে এড়িয়ে চলি। আমাদের জন্য আলো অপরিহার্য। তারপরও কেন জানি আমরা আলোকে অনুধাবন করতে চাই না। কখনো কি ভেবে দেখেছেন? আলো কীভাবে একেক বস্তুকে একেক রঙে আমাদের সামনে হাজির করে? আলো কি কণা? নাকি তরঙ্গ? কেনই বা আলোর এত গতি? আসুন আজ আমরা আলোর ওপর হালকা আলোকপাত করে এমন কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নিই...

আলো কী?

ছোটোবেলায় আলো সম্পর্কে আমাদের খুবই সহজ সরল একটি ধারণা ছিল। আমরা ভাবতাম, এই পৃথিবীতে আলো-অন্ধকার বলে দুটো ব্যাপার আছে, এবং ঘরের দেয়ালের সুইচটা টিপলেই আলো এসে অন্ধকার দূর করে দেয়। কিন্তু আজ আমরা জানতে পারব আলো হচ্ছে এরচাইতেও জটিল কিছু।

প্রায় পনেরো কোটি কিলোমিটারের পথ নিমিষে পাড়ি দিয়ে সূর্যের আলো আমাদের পৃথিবীতে পৌঁছে। কারণ আলোর গতিবেগ হচ্ছে সেকেন্ডে প্রায় ৩ লক্ষ কিলোমিটার। তার মানে হচ্ছে, এইমাত্র পৃথিবীতে সূর্যের যে আলোটা এসে পৌঁছালো সেটা প্রায় আট মিনিট আগে সূর্য থেকে রওনা দিয়েছিল। আরও সহজভাবে বললে, এককাপ কফি তৈরির ফাঁকে আলো সূর্য থেকে পৃথিবীতে এসে আবার সূর্যে ফিরে যেতে পারবে।

আলো মূলত এক ধরনের শক্তি :

কিন্তু আলো ভ্রমণ করে কীভাবে? আপনি হয়তো জানেন, সূর্য হচ্ছে একটি পারমাণবিক আগুনের গোলার মতো। আমরা যে আলো দেখতে পাই তা হচ্ছে সূর্যের পারমাণবিক শক্তির একটি অংশ যা আমাদের চোখে এসে ধরা দেয়। তার মানে, আলোর এক পয়েন্ট থেকে আরেকটি পয়েন্টে ভ্রমণ করার (যেমন সূর্য থেকে পৃথিবীতে আসার) অর্থ হচ্ছে শক্তি এক পয়েন্ট থেকে অন্য পয়েন্টে যাচ্ছে। শক্তি ভ্রমণ করে তরঙ্গ হিসেবে। কিছুটা সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ভাবতে পারেন, (পুরোটা নয়)। আর আলোর তরঙ্গ সমুদ্রের ঢেউয়ের তুলনায় প্রায় ১০০ মিলিয়ন গুণ ছোটো। দুটো ফিল্ডের সমন্বয়ে আলো গঠিত, একটা হচ্ছে ইলেকট্রিক ফিল্ড, আরেকটা হচ্ছে ম্যাগনেটিক ফিল্ড। এই ইলেকট্রিসিটি এবং ম্যাগনেটিজমকে একত্রে ইলেক্টোম্যাগনেটিক ফিল্ড বলে। বলতে পারেন ইলেক্টোম্যাগনেটিক ফিল্ড হলো আলোর আধুনিক নাম। তো, এই ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডের একটা ভাইব্রেশন প্যাটার্ন আছে। আমরা এটা দেখতে পাই না। যদি দেখতে পেতাম তাহলে দেখতাম ইলেকট্রিক ফিল্ডের মান যখন বাড়ছে ম্যাগনেটিক ফিল্ডের মান তখন কমে যাচ্ছে। এবং একটা ফিল্ড আরেকটা ফিল্ডের ৯০° কোণ বরাবর আন্দোলিত হচ্ছে। এবং ঘটনাটা ঘটছে খুবই দ্রুত, সেকেন্ডে ৩ লক্ষ কিলোমিটার হারে। সংক্ষেপে এটাই হচ্ছে আলোর পথচলা।

আলো কণা নাকি তরঙ্গ?

কয়েকশো বছর ধরে বিজ্ঞানীরা আলোর তরঙ্গরূপ নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য হলেন ইংরেজ বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটন ([১৬৪২-১৭২৭](tel:16421727))। এই ব্যাপারে ব্যাপক গবেষণা করার পর তিনি একটি ধারণা দিলেন যে আলো হচ্ছে কণা। কিন্তু ডাচ বিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান হিউজেনস ([১৬২৯-১৬৯৫](tel:16291695)) নিউটনের ধারণার বিপক্ষে গিয়ে বললেন- আলো হচ্ছে তরঙ্গ।

তো, এভাবেই বিতর্ক চলতে লাগল, যা আজও চলছে। কারণটা খুবই সহজ। কিছু ক্ষেত্রে আলো তরঙ্গের মতো আচরণ করে, সে প্রতিফলিত হয়। যেমন আয়না, আয়নায় আলোকরশ্মি পড়ে প্রতিবিম্ব তৈরি করে, ঠিক যেমন সমুদ্রের ঢেউগুলো তীরে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে আলো কণার সারির মতো আচরণ করে, অনেকটা বন্দুক থেকে ক্রমাগত ছুঁড়তে থাকা বুলেটের মতো। যাইহোক, বিংশ শতাব্দীতে পদার্থবিদেরা বলতে শুরু করেছিলেন আলো একইসাথে কণা এবং তরঙ্গ। শুনতে সহজ মনে হলেও আলোর এই “কণা তরঙ্গ দ্বৈততা” খুব জটিল বিষয়।

আলোর স্বভাবগুলো :

আলোক তরঙ্গের (আপাতত তরঙ্গই ধরি) চারটি ইন্টারেস্টিং স্বভাব আছে। স্বভাবগুলো হলো :

• প্রতিফলন (Reflection)
• প্রতিসরণ (Refraction)
• অপবর্তন (Diffraction)
• ব্যতিচার (Interference)

প্রতিফলনঃ

আলোর সবচেয়ে কমন একটা স্বভাব হলো সে যে-কোনো বস্তুর ওপর পড়ে আবার প্রতিফলিত হবে। মূলত এইজন্যই আমরা কোনোকিছু দেখতে পাই। সূর্য বা আলোর অন্য কোনো উৎস থেকে আলো বস্তুর ওপর পড়ে প্রতিফলিত হয়ে তারপর আমাদের চোখে আসে। তখন আমরা বস্তুটাকে দেখি। যদি কোনোভাবে আলোক উৎসটি সরিয়ে ফেলা হয়, অথবা আলোক উৎস থেকে বস্তুটিতে আলো আসতে বাধা দেওয়া হয়, অথবা বস্তুটি থেকে প্রতিসরিত আলোকে আমাদের চোখে আসতে বাধা দেওয়া হয় বা চোখ বন্ধ করে ফেলা হয়, তাহলে চারদিক অন্ধকার হয়ে যাবে। তখন হয়তো আপনি হাতড়িয়ে বস্তুটিকে ছুঁয়ে অনুভব করতে পারবেন, কিন্তু দেখতে পাবেন না।

তো, প্রতিসরণ দুটো উপায়ে ঘটতে পারে, ধরুন আপনার কাছে একটা মসৃণ পৃষ্ঠতল আছে। আপনি এই পৃষ্ঠতলে একটা টর্চ মারলেন, তখন দেখবেন টর্চের আলোটি পৃষ্ঠতলে পড়ে আবার অক্ষতভাবে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসছে। এটাকে বলে ‘নিয়মিত প্রতিফলন’ (Specular reflection)। নিয়মিত প্রতিফলনে আপনি যত ডিগ্রি কোণে আলো ফেলবেন আলোটা ঠিক তত ডিগ্রি কোণ করেই ফিরে আসবে। যাইহোক, বেশিরভাগ বস্তুই এরকম মসৃণ হয় না, তখন কী ঘটে? তখন আলো বস্তুর ওপর পড়ে প্রতিফলিত হবার সময় র‍্যান্ডমলি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এটাকে বলে ‘ব্যাপ্ত প্রতিফলন’ (Diffuse reflection)।

আপনি যদি কোনোকিছুতে আপনার চেহারার প্রতিবিম্ব দেখতে পান তাহলে এটা ‘নিয়মিত প্রতিফলন’ আর যদি না দেখতে পান তাহলে এটা ‘ব্যাপ্ত প্রতিফলন।

প্রতিসরণঃ

আমরা জানি শূন্যস্থানে আলোর তরঙ্গ সোজা চলে। কিন্তু কোনো মাধ্যমের ভেতর চলার সময় তার আরেকটি স্বভাব মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে! বিশেষ করে যখন আলো এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে প্রবেশ করে। তখন সে প্রতিসরিত হয়। এটা আহামরি কিছু না, আপনি হাঁটুজলে একবার দৌড়ানোর চেষ্টা করে দেখতে পারেন! যতই পরিশ্রম করুন, স্বাভাবিক অবস্থার মতো দৌড়াতে পারবেন না। তার মানে মাধ্যম ঘন হলে গতি ধীর হয়ে যায়। ঠিক একই ব্যাপার ঘটে আলোটা যখন পানি, কাচ, প্লাস্টিক বা আরও ঘন কোনো বস্তুর ভেতর দিয়ে যায়। এর কারণ হলো ঘন মাধ্যমের ভেতর চলার সময় আলোর তরঙ্গ বেঁকে যায়। আর এটাই হলো আলোর প্রতিসরণ।

প্রতিসরণ আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য পানি একটি সহজ মাধ্যম। আধা গ্লাস পানিতে একটি কাঠি এমনভাবে রাখুন যাতে কাঠির অর্ধেক পানিয়ে ডোবানো এবং বাকি অর্ধেক পানির ওপর থাকে। এবার গ্লাসের ভেতর দিয়ে কাঠিটাকে লক্ষ করুন, আপনি দেখতে পাবেন কাঠির ওপরের অংশের তুলনায় নিচের অংশ বেঁকে গেছে। কেন এমনটি হচ্ছে? ওই যে বললাম না? প্রতিসরণ। এখানে বায়ু হচ্ছে হালকা মাধ্যম আর পানি হচ্ছে ঘন মাধ্যম, হালকা মাধ্যম থেকে ঘন মাধ্যমে প্রবেশ করার সময় আলো বেঁকে যাচ্ছে, তাই আমরা কাঠিটাকে বাঁকা দেখছি, ব্যাস।

এই আলোর প্রতিসরণ কিন্তু বিভিন্নভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগে। আপনি যদি চশমা ব্যবহার করে থাকেন তাহলে লক্ষ করবেন চশমার লেন্সগুলো এমনভাবে তৈরি যাতে সামনের দৃশ্যগুলো লেন্সে প্রতিসরিত হয়ে তারপর চোখে আসে। যার ফলে দৃশ্যগুলো প্রকৃত অবস্থানের চেয়ে কাছাকাছি দেখা যায়। (কতটুকু প্রতিসরিত হলে চোখ সেটাকে ঠিকভাবে দেখতে পাবে সেটা ব্যক্তিবিশেষে ভিন্ন, তাই চশমার পাওয়ারও ব্যক্তিবিশেষে ভিন্ন হয়ে থাকে)। ঠিক একইভাবে দূরবীন, টেলিস্কোপ, ক্যামেরা, নাইট ভিশন চশমা এবং বিভিন্ন ধরনের লেন্স আলোর প্রতিসরণ স্বভাবকে ব্যবহার করে কাজ করে।

বলছিলাম আলো সোজা পথে চলে, তার মানে কি আলোকে বাঁকা পথে চালনা করা সম্ভব না? অবশ্যই সম্ভব। কীভাবে? খুব সহজে, আলোর চলার পথটাকে বাঁকিয়ে দিয়ে! এমন একটা ‘পথ’ এর নাম হলো ফাইবার অপটিক্স। ক্যাবলের ভেতর কাচের একটা নল থাকে, এটার ভেতর দিয়ে আলোর মাধ্যমে তথ্য স্থানান্তর করা হয়। এটা ইন্টারনেট সংযোগে ব্যবহৃত হয়। ফাইবার অপটিক্স দিয়ে প্রায় আলোর গতিতে তথ্য আদান প্রদান করা যায়। প্রায় বললাম কেন মনে আছে? বলেছিলাম না মাধ্যম যত ঘন হবে আলোর গতি তত হ্রাস পাবে, এখানেও ঠিক সেটাই ঘটছে। ফাইবার অপটিক্সও কাজ করে আলোর দুটি স্বভাব, প্রতিফলন আর প্রতিসরণের মাধ্যমে।

আজ এই পর্যন্তই, সামনে আলোর বাকি দুটো স্বভাব নিয়ে আলোচনা করব।

মূল সোর্স : https://www.explainthatstuff.com/light.html

Writer: AR Mubin

Post a Comment

0 Comments

Close Menu