Advertisement

ডাইনোসরদের বিলুপ্তি, এবং বিজ্ঞানে আবিষ্কারের গল্প

এই আর্টিকেলটির মূল উদ্দেশ্য বিজ্ঞান কীভাবে কাজ করে বোঝানো। সবাইকে পড়তে অনুরোধ করব।

বিজ্ঞান আবিষ্কার


একদিন এক বিজ্ঞানী রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, যাওয়ার পথে তিনি দেখলেন বিশাল এক গর্ত! অনেক ভেবেচিন্তে তিনি বুঝতে পারলেন এ নিশ্চয়ই কোনো বিশাল গ্রহাণুর ধাক্কার গর্ত! কী সাংঘাতিক ব্যাপার হবে যদি এত বড়ো গ্রহাণু পৃথিবীতে পড়ে, নিশ্চয়ই সবাই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এসব ভেবে তিনি রায় দিলেন এভাবেই ডাইনোসররা বিলুপ্ত হয়েছে! সেই রায় বিজ্ঞানমহলে পেশ করলেন, অনেক বিজ্ঞানী মেনে নিলেন, অনেকে নিলেন না। শেষে ভোটাভুটি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো তারটা সবাই মেনে নিবেন কি না। এভাবেই…

থামেন! বিজ্ঞান এভাবে কাজ করে না, বিজ্ঞানে আবিষ্কার এভাবে হয় না। এটা রূপকথার গল্প না, দুনিয়া এত সহজ না, বিজ্ঞান এত সহজ না। যদিও দূর্ভাগ্যবশত বেশিরভাগ মানুষ মনে করেন বিজ্ঞান বুঝি এভাবেই কাজ করে, বিজ্ঞানের আবিষ্কারগুলো বুঝি এভাবেই হয়। সম্ভবত এরকম ধারণার উৎপত্তি বিভিন্ন “ভুল করে আবিষ্কার” এর গল্প রংচং মাখিয়ে ফেইসবুকের মতো সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানোর মাধ্যমে। এই ভুল ভাঙাতে শুধু বয়ান ছেড়ে গেলে কোনো কাজের কাজই হবে না, বরং আমরা ওপরের গল্পটারই আসলে কী হয়েছিল জানার চেষ্টা করি।

বিজ্ঞানের গল্প হলো প্রকৃতির কাছে নাজেহাল হওয়ার গল্প

পৃথিবীর ইতিহাস ঘাঁটতে গেলে সবার আগে দেখা হয় মাটি বা পাথরের স্তর। বছরের পর বছর বায়ু বা পানি প্রবাহের সাথে আসা মাটি-কাদা, মিনারেলস জমা হয়ে মাটি বা পাথরের ওপর একটা একটা করে লেয়ার তৈরি হয়, পাথরের লেয়ার। যে লেয়ার যত নিচে তার বয়স তত বেশি। অনেকসময় এসব লেয়ার তৈরির জন্য আসা কাদা-মাটিতে আটকে যায় অনেক প্রাণী বা প্রাণীর মৃতদেহ। সময়ের সাথে এরা ফসিলে পরিণত হতে পারে। পাথরের একেকটা লেয়ার পৃথিবীর ইতিহাসের বইয়ের একেকটা পাতার মতো। প্রতি পাতায় লেখা আছে সেই সময়কালের জীববৈচিত্র, মাটির গঠন, তাপমাত্রা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক অবস্থার গল্প। [1]

ফসিল হলো মূলত কোনো প্রাণীর জমে পাথর হয়ে যাওয়া! মাটিতে চাপা পড়া কোনো প্রাণীর দেহের ওপর বিভিন্ন খনিজ কণা জমতে জমতে দেহে পচন না ধরে এর অংশগুলো পাথরে পরিণত হলে তাকে ফসিল বলা হয়। অধিকাংশ সময় চামড়া-মাংস পচে যায়, ফসিলে পরিণত হয় প্রাণীর হাড়।

পাথরের একেকটা লেয়ার পৃথিবীর ইতিহাসের বইয়ের একেকটা পাতার মতো

জিওলজিস্ট বা ভূতাত্বিকরা এসব পাথরের লেয়ার নিয়ে আর প্যালিওন্টোলজিস্টরা এসব লেয়ারে আটকে থাকা ফসিল নিয়ে অনেক আগ্রহী। সময়ের সাথে প্রাণী বৈচিত্রের পরিবর্তন এসব পাথরের লেয়ার বাই লেয়ারে খুব সুন্দর দেখা যায়। প্রায় আড়াইশ মিলিয়ন বছর আগে থেকে শুরু হয়েছে ডাইনোসরদের যুগ, ছোটো-বড়ো-বিশাল সব দানবের ফসিল চাপা পড়ে আছে শত শত মিলিয়ন বছর আগের পাথরের স্তরে স্তরে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে ঠিক ৬৫ মিলিয়ন বছরের পর থেকে এদের সব ফসিল গায়েব! ব্যাপারটা প্রথম লক্ষ করেন এক আমেরিকান বিজ্ঞানী, ১৯৭০ সালে। পাথরের এই লেয়ারগুলোর ফসিল নিয়ে গবেষণার সময় তিনি লক্ষ করেন প্রচুর জীববৈচিত্র একটা লেয়ারের ওপর হুট করে গায়েব হয়ে গেছে। শুধু টিকে গিয়েছে খুব ছোটো ছোটো প্রজাতিগুলো। ঠিক যেন পৃথিবীর রিসেট বাটনটা কেউ চেপে দিয়েছে!
মাইক্রোস্কোপের নিচে এই পার্থক্য আরো পরিষ্কার। প্রচুর ফসিলাইজড খোলস হারিয়ে গেছে এই স্তরের পর থেকে।
আর সেই জীববৈচিত্রপূর্ণ ডাইনোসরের ফসিলে ভরা পাথরের স্তর আর নতুন সামান্য ফসিল সমৃদ্ধ পাথরের নতুন স্তর এর মধ্যে দিয়ে চলে গেছে সূক্ষ্ম একটা ধূসর মাটির স্তর, যা দুই যুগের মধ্যে বাউন্ডারির কাজ করছে। শুধু আমেরিকা না, এই জিনিসটা লক্ষ করা গেল পৃথিবীর সব জায়গায়, সব ভূতাত্তিকদের মাথা ঘোরানো বিষয়ে পরিণত হলো জিনিসটা। এই সূক্ষ্ম রেখাটির নাম দিলেন তারা K/T boundary (Cretaceous–Paleogene boundary). যেহেতু এই রেখা চিহ্নিত করে সেই সময়, যখন ক্রেটাসিয়াস যুগের পতন ঘটে আর শুরু হয় টারশিয়ারি যুগ।
(ডাইনোসরদের যুগ মেসোজয়িকের ৩টা অংশ, যথাক্রমে ট্রায়াসিক, জুরাসিক আর ক্রেটাসিয়াস)
কীভাবে সম্ভব হঠাৎ করে এত প্রাণীর প্রায় সবাই গায়েব! সাথে সেই গায়েবের সময়কালে পড়া পাতলা রহস্যময় পাথরের স্তর। এই পাতলা যে কিছু যায়গায় ব্লেইডের মতো ধারালো চিকন!
এটা অবশ্য এই রহস্যের একটা ক্লু, এত চিকন সেই অদ্ভুত স্তরটা। অর্থাৎ খুব বেশি সময় থাকেনি পৃথিবী সেই অবস্থায়।
আর যে ঘটনাই ঘটুক সেখানে, সেটা শুধু স্থানীয় ছিল না, পুরো পৃথিবীতেই তার প্রভাব পড়েছে যেহেতু, নিশ্চয়ই বেশ বড়োসড়ো ঘটনা!
সাথে, এত প্রাণীর একইসাথে বিলুপ্তির খুব সম্ভাব্য কারণ হলো খাদ্যজালের উৎপাদক এর বিলুপ্তি, পৃথিবীর ক্ষেত্রে এই উৎপাদক বলতে উদ্ভিদ, যারা সূর্যের আলোক শক্তিকে রাসায়নিক শক্তিতে আবদ্ধ করে আমাদের জন্য খাবার তথা শক্তির যোগান দেয়। স্বাভাবিকভাবেই, উৎপাদক না থাকলে কোনো পরিবেশের প্রাথমিক খাদক থেকে সর্বোচ্চ খাদকের সবাই খাদ্যাভাবে মারা যাবে।
ভূতাত্বিকরা যখন এই রহস্য সমাধানের কূল-কিনারা খুঁজে পাচ্ছিলেন না তখন এই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসেন নোবেলজয়ী পদার্থবিদ, লুইস ওয়াল্টার আলভারেজ। যেকোনো বিজ্ঞানীর মতো ইনিও ছিলেন রহস্যপ্রেমী, আর পদার্থবিদ হিসেবে এই রহস্যের দিকে তিনি তাকিয়েছিলেন একজন পদার্থবিদের চোখেই।
তিনি দেখলেন এই কে-টি বাউন্ডারিতে একটা মৌল অদ্ভুতভাবে খুব বেশি, ইরিডিয়াম। ইরিডিয়াম পৃথিবীতে দুর্লভ, কিন্তু উল্কাতে সুলভ, পৃথিবীর সার্ফেসে ইরিডিয়ামের উৎস হলো পৃথিবীতে আছড়ে পড়া উল্কা! সারাবছরই পৃথিবীতে হাজার হাজার ছোটো ছোটো উল্কাপিণ্ড আছড়ে পড়ে। সাথে সার্ফেসে যুক্ত হয় কম-বেশি ইরিডিয়াম। কিন্তু অদ্ভুতভাবে সেই কে-টি বাউন্ডারিতে ইরিডিয়ামের পরিমাণ আশেপাশের পাথরের তুলনায় ৩০ গুণ! এই পরিমাণ ইরিডিয়াম সাধারণ স্পেইস ডাস্ট থেকে আসা সম্ভবই না!

আলভারেজ ভাবলেন, এর সম্ভাব্য কারণ কী হতে পারে?
  • i) কোনো সুপারনোভা বিস্ফোরণ হয়েছে ধারে কাছে।(কোনো তারার মূল জীবনের অবসান ঘটে সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে, তারার জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে ভেতর থেকে নিউক্লিয়ার ফিউশনের চাপ আর এই বিশাল ভরের মহাকর্ষকে আটকাতে পারে না, পুরো তারার সব ভর কেন্দ্রের দিকে ছুটে এসে ধাক্কা খেয়ে বিস্ফোরিত হয়)
কিন্তু গত ১০০ মিলিয়ন বছরে এত কাছে কোনো সুপারনোভা বিস্ফোরণের সম্ভাবনা মাত্র ০.০০০০০০০০১%
সাথে সুপারনোভার সাথে দুর্লভ আইসোটোপ প্লুটোনিয়াম ২৪৪ আসার কথা, কিন্তু সেই স্তরে কোনো প্লুটোনিয়াম পাওয়া যায়নি।

  • ii) কোনো বিশাল গ্রহাণুর ধাক্কা। আলভারেজ পরিমাপ করেছিলেন সেই মাটিতে থাকা ইরিডিয়ামের পরিমাণ, আর এই মাটির বা পাথরের স্তর পৃথিবীর সর্বত্র পাওয়া গিয়েছিল। আর গ্রহাণুতে ইরিডিয়ামের পরিমাণও অজানা নয়। এসব মিলিয়ে হিসেব করে বের করা যেতে পারে গ্রহাণুটির সম্ভাব্য আকার কত বড়ো হতে পারে।
উত্তর, ১০ কি.মি. ব্যাসের গ্রহাণু! মাউন্ট এভারেস্টের সমান, ওজনে শত শত কোটি টন! যার ধাক্কা ১০০ মিলিয়ন নিউক্লিয়ার বোমার মতো শক্তি নির্গত করতে সক্ষম।
এরকম ধাক্কায় ধূলিকণা, পাথর আকাশে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে পারে, অন্ধকার হয়ে যেতে পারে আকাশ মাসের পর মাসের জন্য। বন্ধ হয়ে যাবে সালোক-সংশ্লেষণ, মারা যাবে বেশিরভাগ উদ্ভিদ। সাথে মারা যাবে এই উদ্ভিদের ওপর খাদ্যের জন্য নির্ভর করা কোটি কোটি প্রজাতি। বিস্ফোরণে ছিটকে যাওয়া উত্তপ্ত পাথরের বৃষ্টি হতে পারে পৃথিবীজুড়ে।

চমৎকার, কিন্তু নাটকীয় হাইপোথিসিস, অনেক বিজ্ঞানীরই মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিল। এই হাইপোথিসিস প্রমাণের জন্য দরকার আরও অনেক প্রমাণ। বিজ্ঞান প্রমাণের ওপর নির্ভরশীল।

এই হাইপোথিসিসের বিরুদ্ধে বড়ো একটা যুক্তি ছিল, এ ধরনের উল্কার আঘাতে ২০০ কি.মি.র মতো বড়ো গর্তের সৃষ্টি হওয়ার কথা, কিন্তু সে গর্ত কোথায়? প্রচুর খোঁজ চলল এমন গর্তের, যা ৬৫ মিলিয়ন বছর পুরাতন।
কিন্তু, পৃথিবীর দুই তৃতীয়াংশই সমুদ্র। যদি সেই গ্রহাণু সমুদ্রে পড়ে, হয়তো কখনো সেই গর্ত খুঁজেই পাওয়া যাবে না। বলা বাহুল্য, ২০২০ এ এসেও আমরা সমুদ্র তলদেশের মাত্র ৫% এর মতো ম্যাপিং করেছি। [2]

অনেকের মনে এখন প্রশ্ন আসতে পারে, এত বড়ো উল্কা পড়ল, উল্কাটি তো অন্তত খুঁজে পাওয়া যাবে?
আসলে না, এত বড়ো উল্কা যখন এত বেগে কোনোকিছুতে আঘাত করবে তখন এর আঘাত করার গতিশক্তি এর অণুগুলোর মধ্যের শক্তির চেয়ে অনেক অনেক বেশি হবে, ফলস্বরূপ, পাথরখণ্ডটি ভেঙেচুরে অণু-পরমাণুতে পরিণত হবে। এই জিনিসটা হাতেকলমেও পরীক্ষা করে দেখা যায়। মাটির দলা শক্ত করে তৈরি করে দেওয়ালে আস্তে ছুড়ে মারলে এর তেমন কিছু হবেনা। কিন্তু জোরে আঘাত করলে সেই আঘাতের সময় শক্তি মাটির অণুগুলোকে একসাথে ধরে রাখা আন্তঃআনবিক শক্তির চেয়ে অনেক বেশি হবে, ফলে মাটির দলাটা ভেঙে গুঁড়াগুঁড়া হয়ে যাবে। এমনটাও ঘটেছে ইতিহাসে যে বড়ো উল্কার আঘাতে সৃষ্ট গর্তে সহজে লোহা বা অন্যান্য ধাতু পাবার আশায় ধনীরা সে জমি কিনে নিয়ে মাইনিং শুরু করেছেন, যুগের পর যুগ খুঁড়ে তারা কিছুই পাননি। আসলে তারা যা চাচ্ছিলেন তা চারিদিকে ধুলোর সাথে মিশে গেছে।
এ বিষয়ে বিস্তারিত এখানে

যা-হোক, আবার মূল প্রসঙ্গে আসি। এমন গ্রহাণুর ধাক্কায় যে শক ওয়েভ তৈরি হবে তাতে আশেপাশের পাথরগুলোর মধ্যে খনিজ পদার্থের সরণে ভাঁজের মতো লেয়ার তৈরি হবে। যা নিউক্লিয়ার বিস্ফোরণেও দেখা যায়।
সাথে, ইম্প্যাক্ট জোনের আশেপাশে বিভিন্ন ধরনের পাথর দেখা যাবে। যা ইম্প্যাক্টের সময় মাটি বা সমুদ্রের গভীর থেকে আসা পাথর হতে পারে।

এইসব প্রমাণ একসাথে দেখতে পাওয়া গেল মেক্সিকো উপসাগর এলাকায়। এদের বয়সও হিসেব অনুযায়ী মিলে গেল। বিজ্ঞানীরা মোটামুটি নিশ্চিত হলেন এখানেই “কোথাও” উল্কাটি আঘাত হেনেছিল। কিন্তু “কোথাও” যথেষ্ট না, খুঁজে বের করতে হবে সেই গর্ত!
ঠিক সেসময়ই এড়িয়ে যাওয়া পুরাতন এক উপাত্ত সামনে এলো। তেলের খোঁজ করতে মেক্সিকোর ভূতাত্তিক পরিসংখ্যান। হেলিকপ্টারে আকাশ থেকে খালি চোখে কিছু না বোঝা গেলেও ত্রিমাত্রিক জিওলজিক্যাল ম্যাপে কোনো এক বিশাল সংঘর্ষের প্রমাণ স্পষ্ট দেখা যায়। যা সব হিসাব-নিকাশ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর পূর্বে পাওয়া সব প্রমাণের সাথেও খাপে-খাপ মিলে যায়।
এবং এরইসাথে খুঁজে পাওয়া গেল সেই গর্তও! নাম দেওয়া হলো Chicxulub Crater. এই গর্তে অবস্থিত গ্রামের নামে।

একটু রিভিশন দেই,

অবজারভেশন হিসেবে দেখা গেল নির্দিষ্ট সময়ে প্রচুর জীববৈচিত্রের বিলুপ্তি। পরীক্ষা করে দেখা গেল ইরিডিয়ামের পরিমাণ বেশি। হাইপোথিসিস দেওয়া হলো হয় সুপারনোভা অথবা গ্রহাণুর আঘাত। প্রচুর প্রমাণ পাওয়া গেল নিশ্চিত গ্রহাণুর আঘাতের। বিজ্ঞানসমাজে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো–বিশাল গ্রহাণুর আঘাতই ক্রেটাসিয়াস বিলুপ্তির কারণ।
এখন গল্পের বাকি হিসাব সহজেই মিলে যাবে।

কীভাবে হলো এই ডাইনোসরদের বিলুপ্তি?
অনেকেই মারা যায় গরমে পুড়ে, জীবন্ত সেদ্ধ হয়ে! উল্কার আঘাতে আশেপাশের শত শত কিলোমিটারের সবাই ভস্মীভূত হয়ে যায়। উত্তপ্ত পাথরের বৃষ্টিতে, আকাশে তাপের প্রতিফলনে গরম সহ্য করতে না পেরে মারা যায় অনেক প্রাণী। ওপরেই বলেছি, মাসের পর মাস গ্রহাণুর আঘাতে আকাশ অন্ধকার থাকায় সালোক-সংশ্লেষণ না করতে পেরে মারা যেতে থাকে গাছগুলো, সাথে মারা যায় তৃণভোজী বেশিরভাগ প্রাণীরা। তাদের না খেতে পেরে মারা যায় মাংসাশী প্রাণীরা। তবে সবাই না। যাদের সাইজ ছোটো, কম খেয়েই বেঁচে থাকতে পারে। সাথে বেঁচে যায় স্ক্যাভেঞ্জার বা ধাঙড়রা, যারা যা পায় তাই খেয়ে বাঁচে, মরদেহ থেকে শুরু করে জীবন্ত প্রাণী। যেমন কুমির। সাথে বেঁচে যায় ছোটো ছোটো ডাইনোসররা, ২৫ কেজির ওপরের স্থলচর প্রাণীরা কেউ বাঁচেনি। বেঁচে যাওয়া ছোটো ছোটো ইঁদুর-বেজির ন্যায় ম্যামাল থেকেই এসেছি আমরা। এসেছে আমাদের আশেপাশের সব স্তন্যপায়ী বা ম্যামাল। আর ডাইনোসরের বংশধর হলো পাখিরা। হ্যাঁ, পাখিরাই মডার্ন ডাইনোসর।
গ্রহাণুর আঘাতে বিলুপ্ত হয়ে গেল এত বৈচিত্রময় জীবেরা। এখন আশা করি অনেকেই বুঝতে পারছেন কেন আমাদের একাধিক গ্রহের প্রাণী হওয়া উচিৎ।

নেক্সট ১০০ বছরে কোনো ওরকম বড়ো উল্কার আঘাতের সম্ভাবনা নেই। কিন্তু উল্কার গতিপথের হিসাব-নিকাশে অনেক অনিশ্চয়তা আছে, যত বেশি ভবিষ্যতে তাকানো যায় এফিসিয়েন্সি তত কমে। সম্ভাবনা থেকেই যায় পরবর্তী শতকেই হয়তো ঐ সাইজের কোনো উল্কা আঘাত হানবে। এত বড়ো উল্কার খোঁজ পেলে সেটাকে নিউক্লিয়ার বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া যায় না? না, যায় না। এটা রিয়েল লাইফ, হলিউড মুভি না। বিস্তারিত এখানে

পৃথিবী এত বড়ো যে, বাংলাদেশ সাইজের দেশকে ধ্বংস করে দেওয়ার মতো উল্কা আসতে থাকলে সম্ভাবনা আছে আমরা টেরও পাবো না যথেষ্ট আগে। এসব নিয়ে বিস্তারিত লেখবো অন্য কোনোদিন।

তবে উল্কা বা গ্রহাণুর আঘাত নিয়ে বেশি চিন্তা করার কিছু নেই। বরং চিন্তা করা দরকার চলতে থাকা ক্লাইমেট চেইঞ্জ নিয়ে, বর্তমানে আমাদের বিলুপ্তির সম্ভাবনা এর দ্বারাই সবচেয়ে বেশি, এ বিষয়ে পড়তে পারেন এই লেখাটি।

এই আর্টিকেলটি The Day the Mesozoic Died ডকুমেন্টারি থেকে ইন্সপায়ার্ড হয়ে লেখা।

[বি.দ্র: আর্টিকেলটি পড়ে অনেকের মনে হতে পারে মাস এক্সটিঙ্কশন খুব দুর্লভ জিনিস, ইতিহাসে একবারই হয়েছে হয়তো। আসলে না, এই নিয়ে পৃথিবীতে মোট ৫ টি মাস এক্সটিঙ্কশন ঘটেছে, এটা ছিল শেষেরটা।

Writer: Samudra Jit Saha

Post a Comment

0 Comments

Close Menu