Advertisement

মেঘ কিভাবে সৃষ্টি হয়?



" কালো মেঘে আকাশ ঢাকা

ঐ সাদা বক মিলছে পাখা।"

স্কুল থেকে আসার পথে,বিকেলে ছাদে পায়চারি করার সময় এ দৃশ্য কে না দেখেছে? বছরের বিভিন্ন সময়ে কত ধরণের মেঘ আমরা দেখি। সাদা বককে স্পষ্ট করে দেওয়ার মতো আকাশ জুড়ে ঘন কালো মেঘ বা আকাশের কোনো একপাশে দিগন্ত থেকে উঠে আসা পাহাড়ের মতো উঁচু কালো মেঘ, কখনও তুলোর স্তূপের মতো সাদা মেঘ,কখনো বা নীল আকাশে ছড়িয়ে থাকা পাতলা পালকের মতো মেঘ। সারা বছর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রকারের মেঘ সৃষ্টি হয় আবার মিলিয়েও যায়। কৌতূহলী মনে এই প্রশ্ন স্বাভাবিক মেঘ সৃষ্টি হয় কেমন করে?

মেঘ সৃষ্টির রহস্য জানতে হলে আমাদের কয়েকটি ছোট ছোট বিষয়ে জানতে হবে।

পৃথিবীকে ঘিরে থাকা বায়ুমন্ডল ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় দশ-হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হলেও এই বিশাল বায়ুমন্ডলের ভরের আশি শতাংশ ভূপৃষ্ঠ থেকে মাত্র বারো কিলোমিটারের মধ্যে আছে। হাইস্কুলে আমরা শিখেছি বায়ুমন্ডলের এই অংশকে ট্রপোস্ফিয়ার বলে। । সাধারণ বুদ্ধিতে আমরা বুঝতে পারি ভূপৃষ্ঠে বায়ুর চাপ সবচেয়ে বেশি এবং যত উপরে ওঠা যায় বায়ুর চাপ তত কমতে থাকে। সাথে সাথে ভূপৃষ্ঠ থেকে যত উপরে ওঠা যায় বায়ুর ঘনত্ব কমতে থাকে। আরেকটি তথ্য যা আমাদের মেঘ সৃষ্টির রহস্য বুঝতে বেশি কাজে লাগবে তা হলো, ট্রপোস্ফিয়ারে ভূপৃষ্ঠ থেকে যত উপরে যাওয়া যায় উষ্ণতা তত কমতে থাকে,প্রতি এক কিলোমিটারে 6.5℃ হারে। এটা কেবল মাত্র এই স্তরের জন্যই প্রযোজ্য, অন্যান্য স্তরের তথ্য আমাদের মূল প্রসঙ্গের জন্য দরকার নেই।

এবার জেনে রাখা দরকার কী কী উপাদান দিয়ে আমাদের বায়ুমন্ডল তৈরি। আমরা সকলেই কম বেশি এটা জানি। বায়ুমন্ডলে সবচেয়ে বেশি যে দুটি উপাদান উপস্থিত থাকে তা হলো নাইট্রোজেন(78%) ও অক্সিজেন(21%)। এছাড়া আছে আর্গন , কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য গ্যাস। কিন্তু যে দুটি উপাদান ছাড়া মেঘ সৃষ্টি সম্ভব নয় তা হলো জলীয়বাষ্প( জলের গ্যাসীয় অবস্থা) ও ধুলো। বায়ুমন্ডলে এই দুটি উপাদানের পরিমান নির্দিষ্ট নয়। স্থান ভেদে,সময় ভেদে,মানুষ ও প্রাকৃতিক ক্রিয়ার সাথে এদের পরিমাণ পরিবর্তিত হয়। বায়ুতে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ শূন্য শতাংশ থেকে চার শতাংশের মধ্যে থাকে। সূর্যের তাপে জলাশয় (সাগর,নদী, হ্রদ,পুকুর) থেকে মুক্ত হওয়া জলীয় বাষ্প, প্রকৃতি বা মানুষের কারণে জ্বালানির দহন বা বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার জন্য মুক্ত জলীয় বাষ্প বাতাসে মেশে। একটি এলাকায় বিভিন্ন সময়ে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বিভিন্ন হয়।

একই ভাবে ধুলোর পরিমানও বায়ুতে হেরফের হয়। আগ্নেয়গিরিরধোঁয়া,দাবানল,শিল্পা

ঞ্চল,যানবাহন নিঃসৃত ধুলো বাতাসে মেশে।এদের উপাদান রাসায়নিক ভাবে জৈব ও অজৈব দু-প্রকারের হতে পারে।কার্বনের কোনো যৌগের অনু বা অনুর সমষ্টি,সাগর থেকে মুক্ত হওয়া নুনের অনু,ব্যাকটেরিয়া ইত্যদি নিয়ে ধুলোর উপাদান তৈরি।এগুলি আকারে খুব ক্ষুদ্র হয়। বৃষ্টির ফোঁটার ব্যাস(1000 মাইক্রো মিটার,1সেন্টিমিটার কে দশ হাজার ভাগে ভাগ করলে একভাগ কে বলে এক মাইক্রো মিটার) এর তুলনায় প্রায় দশ হাজার গুণ ছোট ও জলের অনুর তুলনায় 364 গুন বড় এই সব ধুলো কণার ব্যাস। তাই এদের খালি চোখে দেখা যায় না। ধুলোর সব উপাদান রাসায়নিক ভাবে জলের অনুর প্রতি আসক্ত হয় না। তবে বায়ুমন্ডলে ধুলোর কণার উপস্থিতি ছাড়া মেঘ গঠন সম্ভব নয়।

এবার আসা যাক মেঘ গঠনের মূল প্রসঙ্গে। যে কোনো কারণে যখন কোনো স্থান উত্তপ্ত হয়ে ওঠে তখন ওই স্থানের বিভিন্ন জলের উৎস থেকে জলীয় বাষ্প বায়ুতে এসে মেশে ও ওই স্থানের সংস্পর্শে থাকা বায়ু আশে পাশের বায়ুর তুলনায় গরম হয়ে ওঠে।গরম বায়ুতে থাকা জলের অনু ও বায়ুর অন্যান্য গ্যাসের অনু অতিরিক্ত তাপীয় গতিশক্তি পেয়ে তুলনামূলক বেশি জায়গা জুড়ে ছোটা ছুটি শুরু করে অর্থাৎ গরম বায়ুর আয়তন বাড়ে,তাই চারপাশের সাধারণ বায়ুর তুলনায় ঘনত্ব কমে যায়। ফলে কম ঘনত্বের গরম বায়ু সাধারণ বায়ুর উপর ভেসে ওঠে অর্থাৎ গরম বায়ু উপরের দিকে উঠতে শুরু করে।

এখন গরম বায়ু যত উপরে উঠে আসে ততই বেশি চাপের অঞ্চল থেকে কম চাপের অঞ্চলের দিকে যায়। চাপ কমতে থাকার জন্য এটি আয়তনে প্রসারিত হতে থাকে ও যত প্রসারিত হতে থাকে জলের অনু(জলীয়বাষ্প) সহ অন্যান্য গ্যাসের অনুর গতিশক্তি কমতে থাকে। অন্য কথায় প্রসারিত হওয়ার সাথে সাথে এই বায়ুর তাপমাত্রা কমতে থাকে। এরকমটা হওয়ার কারণ বায়ু তাপের কুপরিবাহী বলে চারিপাশের সাধারণ বায়ুর সাথে তাপের আদান প্রদান হয় না,সাধারণ বায়ুতে মিশে থেকেও এই বায়ু একেবারেই বিচ্ছিন্ন। এই রকম তাপশক্তিগত ভাবে পরিবেশ থেকে বিছিন্ন কিছু পরিমাণ গ্যাস যদি প্রসারিত হয় তবে প্রসারণের জন্য যে কার্য তা নিজেদের গতিশক্তি ব্যায় করেই করতে হয়,তাই তাপমাত্রা কমে যায়।

এই জলীয় বাষ্প মিশ্রিত বায়ুর উচ্চতার সাথে উষ্ণতা হ্রাসের হার পরিবেশের (6.5℃/km) থেকে আলাদা হয়। সাধারণত যেটা হয় এই উষ্ণতা হ্রাসের হার পরিবেশের তুলনায় বেশি হয়। এর ফলে একটা উচ্চতায় এসে দেখা যায় বিচ্ছিন্ন ওই বায়ুর উষ্ণতা উপরের পরিবেশের বায়ুর তুলনায় কমে গেছে,বায়ু আর চারপাশের তুলনায় গরম নেই ও পরিবেশের সাধারণ বায়ু ও বিচ্ছিন্ন বায়ুর ঘনত্ব সমান হয়ে গেছে। এই উচ্চতায় মেঘ সৃষ্টি শুরু হয়। কেমন করে?

জলীয়বাষ্প পূর্ণ বায়ুর তাপমাত্রা যত কমতে থাকে এদের গতিশক্তি কমতে থাকে এবং তাদের কাছাকাছি আসার সম্ভবনা বৃদ্ধি পেতে থাকে যার ফলে তাদের জুড়ে গিয়ে জলকণা তৈরির সম্ভবনাও বাড়ে। কতটা কাছাকাছি আসবে তা নির্ভর করে ওই বায়ুতে কি পরিমাণ জলীয় বাষ্পের ভিড় আছে তার উপর ও উষ্ণতার উপর। একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় নিদিষ্ট পরিমাণ বায়ুতে একটি সর্বোচ্চ পরিমান জলীয় বাষ্প থাকতে পারে। যেমন 25℃ উষ্ণতায় 1কেজি বায়ুতে সর্বোচ্চ 23-24 গ্রাম জলীয় বাষ্প থাকতে পারে। সর্বোচ্চ পরিমাণের থেকে বেশি হলে অতিরিক্ত জলীয় বাষ্প যে কোনো ভাবে জলকণায় পরিণত হয়ে বায়ু থেকে বেরিয়ে আসে। ধুলোর কণা সর্বত্র ছড়িয়ে আছে কিন্তু কম উচ্চতায় জলের অনুর গতিশক্তি এত বেশি থাকে(তাপমাত্রা বেশি) যে জলাকর্ষী ধুলো কণা গুলি জলের অনুদের আকর্ষণ করে নিজেদের গায়ে আটকে রাখতে পারে না।কিন্তু ওই উচ্চতায় জলের অণুগুলোর গতিশক্তি অনেকটাই কমে যায় ,অন্য ভাবে বললে ওই পরিমাণ জলীয় বাষ্প ওই উচ্চতার তাপমাত্রায় জলীয় বাষ্পের সর্বোচ্চ পরিমাণকে অতিক্রম করে। আবার জলের অনুর সংখ্যার অনুপাতে গতিশক্তি এতোটাই কমে যায় না যে জলের অনুগুলো নিজেরাই জুড়ে গিয়ে ছোট ছোট জলকণা তৈরি করবে। এই গতিশক্তিতেও জলের অনুর বন্ধন শক্তি জলের অনুগুলোকে একত্রিত করে ছোট ছোট জলকনায় আটকে রাখতে যথেষ্ট নয়। কিন্তু এই গতিশক্তিতে জলাকর্ষী ধুলো কণা জলের অনুগুলোকে বন্দি করতে পারে নিজেদের গায়ে। অব্যশই শুধু গতিশক্তি নয় , কি পরিমান জলীয় বাষ্প আছে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।যাই হোক এই অবস্থায় জলীয় বাষ্প ধুলো কনায় আশ্রয় গ্রহণ করে তৈরি করে মেঘের কণা। মেঘের কণার ব্যাস ধুলোর তুলনায় 100 গুন। এর ফলে এই উচ্চতায় এক স্তরের মেঘ দেখা যায় কিন্তু এখানেই শেষ নয়। ধুলো কণাকে আশ্রয় করে জলীয় বাষ্প যখন জল কনায় পরিণত হয় তখন জলীয় বাষ্পে থাকা অতিরিক্ত তাপ শক্তি মুক্ত হয়ে বিচ্ছিন্ন বায়ুর উষ্ণতা পুনরায় বাড়িয়ে দেয়,এটি তখন যদি পারিপার্শ্বিক বায়ুর তুলনায় উত্তপ্ত হয় তবে এবার বায়ু উপরে উঠতে থাকে ও মেঘের কণা সৃষ্টি হতে থাকে।এই মেঘ নির্দিষ্ট উচ্চতায় আবদ্ধ না থেকে বিস্তৃত স্তরীভূত মেঘ তৈরি হয়। তুলোর মতো বা পাহাড়ের মতো যে বিশাল মেঘ তৈরি হয় এই ভাবেই তৈরি হয়। শেষে মেঘের কনা ভাসতে থাকে ও ঠান্ডা বায়ু আর উপরে না গিয়ে নীচে নেমে আসে। আমরা আকাশে যে মেঘ দেখি তাদের অবস্থান সর্বনিম্ন 500 মিটার থেকে 6 কিলোমিটারের মধ্যে। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা দরকার আমরা যে শীতকালে কুয়াশা দেখি তাও একধরণের মেঘ।

এখন বলে রাখা দরকার বায়ুর উপরের দিকে ওঠার জন্য সবসময় উষ্ণ হওয়া দরকার নেই,অন্য ভাবেও বায়ু উপরে উঠে মেঘ তৈরি হতে পারে। জলীয় বাষ্প পূর্ণ বায়ু কোনো পাহাড় বা উঁচু জায়গায় ধাক্কা খেয়ে ডাল বেয়ে উপরে উঠে মেঘ সৃষ্টি করতে পারে, আবার জলীয়বাস্প পূর্ণ বায়ু বরফের উপর দিয়ে বা শীতল অঞ্চলের উপর দিয়ে যাওয়ার সময় মেঘ সৃষ্টি হয়। কোনো অঞ্চলে বিশেষ কারণে চারিদিক থেকে তীব্র বেগে বায়ু ছুটে এসে সমস্ত বায়ু একত্রিত হয়ে উপরে উঠলে মেঘ সৃষ্টি হয়।

পৃথিবীর জীবন সৃষ্টি ও প্রবাহের জন্য যে জল চক্র তা মেঘ ছাড়া অসম্পূর্ণ। আদিকালে মেঘ সৃষ্টির মাধ্যমে যদি বাস্পভুত জল না ফিরে এলে জীবন মুখর নীল গ্রহ সৃষ্টি হতো না।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার:-

1) introduction to atmospheric and space science IIT Roorkee July 2018 https://www.youtube.com/

playlist?list=PLLy_2iUCG87C37Th

J4x4VgwDkMLupSBFy

2)mel strong

https://youtu.be/LrG2j82bqPM

3) wikipedia---cloud physics

লিখাঃ অর্পণ দত্ত

Post a Comment

0 Comments

Close Menu